বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর ২০২০ ইং, ১৬ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
অনুপ্রেরণা
জানুয়ারি ২৭, ২০২০,  ৬:১২ অপরাহ্ণ
অনুপ্রেরণা

প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটা লক্ষ্য থাকে। লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আর এই পরিশ্রমের পেছনে যদি কোন ব্যাক্তির অনুপ্রেরণা কাজ করে, তাহলে পরিশ্রমটা আরও জোড়ালো হয়ে ওঠে।

আমাদের এই গল্পটা একটা মানুষের জীবনে কঠোর প্ররিশ্রমের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প। আশা করি এই গল্পটা পাঠ করে পাঠক সমাজের মনে সামান্য হলেও অনুপ্রেরণা নামক বিষয়টি সৃষ্টি হতে পারে।

আমাদের এই গল্পটা যাকে নিয়ে তাঁর নাম রায়হান। রায়হানের বাবা ছিলেন একজন তাঁতী। তাঁতের কাজ করার মাধ্যেমে তাদের পারিবারীক জীবন প্রচালিত হতো। রায়হান ও ছোট বেলা থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি তাঁতের কাজ করত। সকালে স্কুলে যাওয়ার পর স্কুলে দুপুরে টিফিন দিলে সে বাকি ক্লাস না করে বাড়ি চলে আসতো। বাড়ি এসে সে অন্যের বাড়িতে তাঁতের কাজে যেত। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে পড়তে বসতো।

বিকেলে যখন তাঁর সহপাঠিরা মাঠে খেলতো, আর তখন সে অন্যের বাড়িতে কাজে ব্যস্ত। সকাল থেকে দুপুর স্কুল, দুপুর থেকে সন্ধ্যা অন্যের বাড়িতে তাঁতের কাজ আর রাতে পড়াশোনা। এভাবেই তাঁর শৈশব, কৈশর কেটেছে।

রায়হান মাধ্যমিকে ব্যবসা বিষয় থেকে এ+ নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়। কলেজ জীবন নাকি সব ছেলে-মেয়েদের আনন্দময়, রোমাঞ্চকর হয়। কিন্তু রায়হানের কলেজ জীবন একটু অন্য ভাবেই কেটেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলে-মেয়েকে পড়াতো। এরপর অন্যর বাড়িতে তাঁতের কাজে চলে যেত। সেই সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফিরত। আর সন্ধ্যার পর তার নিজের পড়াশোনা। সে কলেজে খুবই কম যেত।

তার কারণ, তাদের কলেজে কোনো আনুষ্ঠানিক পোশাক ছিল না। সবাই রং বিরঙের পোশাক পড়ত। প্রথম অবস্থায় রায়হান কলেজে প্রায় নিয়তিমই যেত। কিন্তু কলেজে যখন সবাই রং-বিরঙের পোশাক পরিধান করে আসতো, আর রায়হান প্রতিদিনই একই পোশাক পরিধান করতো। আর সে একই পোশাক পরিধানের জন্য সবার কাছে হাসির পাত্র হয়ে উঠে। এরপর সে শুধু কলেজের পরীক্ষার সময় হলেই কলেজে যায়। এভাবেই তার কলেজ জীবন শেষ হয়। সারাদিন কঠোর প্ররিশ্রম আর রাতে পড়াশোনায়। সে উচ্চমাধ্যমিকে ব্যবসা শাখা থেকে ৪.৭৬ জিপিএ পায়।

এরপর আসে বিশ্বিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধ। ভর্তি যুদ্ধর জন্য প্রস্তুতি নিতে সে কিছুদিনের জন্য তাঁতের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। তাদের বাড়ি থেকে আনুমানিক প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে একটি বিশ্বিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি কোচিং ছিল। সে ঐ কোচিং এ ভর্তি প্রস্তুতের জন্য ভর্তি হয়। সেই কোচিং এর পরিচালককে তার পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কথা বলে সে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে সেখানে ভর্তির সুযোগ পায়।

আর্থিক সমস্যার জন্য সে মাত্র ৪টা বিশ্বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। এর মধ্যে দুইটা বিশ্বিদ্যালয়ে সে ভর্তির সুযোগ পায়। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিদ্যালয় আর অন্যটি ইসলামী বিশ্বিদ্যালয়।

রায়হানের ইচ্ছে ছিল ইইই তে পড়বে। আর সেই বিষয়টা সে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
বিশ্বিদ্যালয়ে পায়। এদিকে রায়হান ইসলামী বিশ্বিদ্যালয়ে বিষয় চয়েছ দিয়েছে, এখনও কোন বিষয় নিয়ে পড়তে পারবে সেটার ফলাফল বের হয়নি।

এদিকে পাবনা তে ভর্তির তারিখ দিয়ে দিছে। রায়হান সিদ্ধান্ত নিল যে পাবনাতেই ভর্তি হবে। কিন্তু সে ভর্তি হতে পারছে না। কারণ ভর্তির জন্য ১২,০০০ টাকা প্রয়োজন। সে তার বাবার কাছে ভর্তির জন্য টাকা চায়। তার বাবা বলে আমি টাকা দিতে পারবো না। তোর ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। রায়হান বুঝতে পারে তার বাবা রাগ করে এ কথা বলেনি। তাঁর বাবার কাছে এতগুলো টাকা নেই। তাই তার বাবা তাকে একথা বলেছে। কাল রায়হানের পাবনা বিশ্বিদ্যালয়ে ভর্তির শেষ দিন। এখন সে এতগুলো টাকা কোথায় পাবে, কে দিবে তাকে এতগুলো টাকা।

পাবনাতে যদি ইইই তে ভর্তি বাতিল করে যদি ইবিতে ইইই বিষয়ে না হয় তাহলে এদিকও যাবে ওদিক ও যাবে। রায়হানের বাড়ির পাশের একটি ভাই পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিদ্যালয়ে পড়ে। রায়হান তখন সে ভাইকে ফোন করে। রায়হানের আর্থিক বিষয় ভাইকে খুলে বলে। ভাই তাকে বলে তুমি কাল ক্যাম্পাসে আসো আমি একটি ব্যবস্থা করে দিবো।

রাত যায়, রায়হান ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে তার কাছে ২ শত টাকা ছিল। আর সেটা নিয়ে সে বাড়ি থেকে পাবনার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে সে পাবনা বিশ্বিদ্যালয়ে সেই বড় ভাইয়ের রুমে যায়।

বড় ভাইয়ের রুমমেট রায়হানকে বলে তুমি বাড়ি থেকে কিছু টাকা ম্যানেজ কর আর আমি বাকি টাকা যা লাগে দিব। রায়হান বাড়ি তার বাবাকে ফোন দিয়ে টাকার কথা বলে। তার বাবা অন্যর কাছে থেকে ৭০০০ শত টাকা ম্যানেজ করে রায়হানের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর বাকি টাকা টা সেই বড় ভাই আর বড় ভায়ের রুমমেট দেয়।

সেই দিন ছিল চারটা পর্যন্ত ভর্তি হওয়ার শেষ তারিখ। রায়হান ভর্তি হতে একাডেমিক শাখায় যায়। একাডেমিক শাখায় সিরাজগঞ্জের এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। সেই ভাই আবার পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলিগ নেতা। রায়হান তার কথা সেই বড় ভাইকে বলল, বড় ভাই তাকে আর্থিক সংকটের বিষয় নিয়ে আবেদন পত্র লিখতে বলে। আবেদন পত্রটি বড় ভাই স্যারের কাছে নিয়ে যায় এবং ডিপার্টমেন্ট ফি বাবদ যে ৪০০০ টাকা ছিলো সেটা মাফ করিয়ে দেয়।

ভর্তির সময় প্রায় শেষের দিকে। বড় ভাই রায়হানকে বলে তুমি ভর্তি ফরম পূরণ কর আমি ব্যাংকে তোমার টাকা জমা দিয়ে আসি। অনেক কষ্টের পর রায়হানের ভর্তি হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সেই দিনই রাত ৮টার সময় রায়হানের মোবাইলে খুদে বার্তা আসে, ইবিতে রায়হান ইইই বিষয় পেয়েছে। এখন রায়হান ভাবতে লাগলো, পাবনার থেকে ইবি আবার চাহিদার দিক থেকে এবং আরো অনেক দিক থেকে বিচার করতে গেলে ইবিই বেষ্ট। তারপর সে ভাবে যে নাহ, যত কষ্টই হোক আমি টাকা ম্যানেজ করে ইবিতে ভর্তি হব।

তারপর রায়হান পাবনা থেকে বাড়িতে এসে দিনরাত কঠোর প্ররিশ্রম করে তাঁতের কাজ করে ইবিতে ভর্তির জন্য টাকা জোগাড় করে। পড়ে ইবিতে ভর্তি হয়। ইবিতে (২০১৬-২০১৭) বর্ষের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। এক মাস ক্লাস শেষ, কিন্তু রায়হান কোথায়? রায়হান ইবিতে এক মাস ক্লাস না করে ভর্তি হওয়ার জন্য মানুষের কাছে থেকে যে টাকা ধার নিয়েছিল, সেটা পরিশোধ করে। দিন রাত কঠোর প্ররিশ্রম করে সব ধার পরিশোধ করে এক মাস পর ইবিতে আসে।

ইবিতে সে হলে জায়গা পায় না। এক মাস থাকে ক্যাম্পাসের পাশে। পরের মাসে লালন শাহ হলের গণরুমে থাকার সুযোগ পায়। বাড়ি থেকে আসার সময় যে টাকা নিয়ে আসছিলো সেটা এক মাসের ভাড়া এবং খাওয়া দিয়ে শেষ হয়ে যায়। রায়হান বুধবার ক্লাস শেষে বাড়ি চলে যেত। বাড়ি যেয়ে সে লুঙ্গি তৈরি করত এবং তার বাবা এক সপ্তাহে যে কয়টা লুঙ্গি তৈরি করতো সেগুলো সে প্রতি সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যায় নিয়ে আসতো। রায়হান প্রতি রাতে ১০-১২ পর্যন্ত প্রত্যেক হলের রুমে রুমে লুঙ্গির ঝোলা কাঁধে করে লুঙ্গি বিক্রয় করত। প্রতি সপ্তাহে লুঙ্গি বিক্রি করে যে টাকা হতো সেটা তার বাড়িতে দিত এবং কিছু টাকা তার খরচের জন্য রাখতো।

একদিন রাতে রায়হান প্রতি দিনের মতোই জিয়া হলে গেছে লুঙ্গি বিক্রয়ের জন্য। তো এক রুমের একটি বড় ভাই তাকে ডাকে। সেই ভাইয়ের নাম হালিম। সেই ভাই রায়হানকে বলে, এই তুমি ক্যাম্পাসের না বাইরের? ভাই আমি ক্যাম্পাসেরই, ১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চার পাঁচ বছর আছি তা এখন পর্যন্ত একটি বিজনেস করতে পারলাম না আর তুমি দুদিন এসেই বিশ্ববিদ্যালয় বিজনেস শুরু করে দিছো।

রায়হান তার সব কাহিনি হালিম ভাইকে খুলে বলে। হালিম ভাই তখন রায়হানের দিকে তাকায়ে, রায়হানের কথা শুনে তার কষ্টটা বুঝতে পারে। তখন হালিম ভাই রায়হানকে বলে তুমি একটা কোচিং এ নবম-দশম শ্রেণির ক্লাস নিতে পারবে? রায়হান এই কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় এবং মনে মনে ভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে কোচিং, আমি যদি কিছু বোঝাতে যাই তাহলে ছাত্র-ছাত্রিরা তো উল্টো আমায় বোঝায়ে দিয়ে কোচিং থেকে বের করে দিবে। না ভাই আমার দ্বারা সম্ভাব না। হালিম ভাই তখন রায়হানকে ভালো করে বোঝায়। তখন রায়হান এক পর্যায়ে হালিম ভাইয়ের কথায় সম্মতি জানায়।

পরদিন হালিম ভাই রায়হানকে কোচিং এ ক্লাস নেয়ার জন্য নিয়ে যায়। এরপর থেকে রায়হান কোচিং এ ক্লাস নিতে শুরু করে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্কলার শিপের আবেদন করে এবং স্কলারশিপ টা পেয়ে যায়। কোচিং এ ভালো ক্লাস নেয়ার কারণে অনেক গুলো হোম টিউশনের সুযোগ পায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রায়হানের জীবন সুন্দর হতে শুরু করে। এখন রায়হান অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। এখন সে আমাকেও পড়াচ্ছে। কোচিং এ নবম-দশম শ্রেণির একা পরিচালনা করতে তার একটু কষ্ট হয়ে যায়। তাই সে একটি ছেলেকে নিয়োগ দেয় কোচিং এ ক্লাস নেয়ার জন্য। আর সে ছেলেটি আমি। যেই রায়হান এক সময় টাকার জন্য হলের রুমে রুমে লুঙ্গি বিক্রি করেছে, আজ সেই রায়হানই এখন আমার মতো কলেজ পড়া ছাত্রকে কোচিং এ একটি দ্বায়িত্ব দিয়েছে।

গল্পটা পড়ে পাঠক সমাজের মনের মধ্যে কেমন লেগেছে সেটা আমি জানি না। তবে গল্পটা আমার মা পড়তে যায়ে দেখি, আমার মায়ের চোখের জলরাশি প্রবল ধারায় বয়ে চলেছে।

জুবায়ের আহমেদ অভি
শিক্ষার্থী,
পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন