শনিবার, ১১ই জুলাই ২০২০ ইং, ২৭শে আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
আই কান্ট ব্রিদ
জুন ৯, ২০২০
আই কান্ট ব্রিদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য মহাদেশর মানুষ অভিবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ইউরোপ এবং আমেরিকায় দল বেধে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসতে আরম্ভ করে। পশ্চিমা অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য শ্রমিক হিসাবেই তাদের আনা হয়েছিল। কিন্তু এই সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকায় শ্বেতাঙ্গদের মনে জাগত হলো এদের না ঠেকালে এক সময় তারা সংখ্যায় আমাদের চেয়েও ছড়িয়ে যাবে। আর তখন শুরু হলো উল্টো প্রতিক্রিয়া যে ভাবে পারো অভিবাসন ঠেকাও। এই প্রতিক্রিয়ার জের ধরে বিশ্বের প্রধান ক্ষমতাশীল দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্ণবিদ্বেষী জাতীয়তাবাদ মনোভাব জাগ্রত হয়েছিল। মার্কিন সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রে রন্ধে রন্ধে বর্ণবাদ এখনো ঝেঁকে বসে আছে তার প্রমাণ বহন করে।

গত ২৫ মে আমেরিকার মিনিসোটা অঙ্গরাজ্য মিনিয়াপোলিসা শহরে ড্রক শোয়িন(৪৪) নামে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা জর্জ ফ্লোয়েড (৪৬) নামে এক কৃষ্ণাঙ্গকে পাশবিক কয়দায় হত্যার মধ্যে দিয়ে। ঐ দিন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ফ্লোয়েডের ঘারে তার হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে আছে। ফ্লোয়েড নি:শ্বাস না নিতে পেরে কাতরাচ্ছেন এবং বারবার শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারকে বলছেন, আমি শ্বাস নিতে পারছি না (আই কান্ট ব্রিদ)। কিন্তু বর্ণবিদ্বেষী আমেরিকান ঐ পুলিশ কর্মকর্তার মনে এতটুকু করুণার জন্ম হয়নি। জর্জ একটি রেস্তোরাঁয় নিরাপত্তা কর্মী হিসাবে কাজ করতেন। সন্দেহভাজন এক প্রতারণার ব্যাপারে খবর পেয়ে পুলিশ তার প্রতি বর্ণবিদ্বেষী ক্রোধ উগ্রে দেয়। ফ্লোয়েড হত্যাকাণ্ড কেন্দ্র করে ভাইরাল হয় দশ মিনিটের একটি ভিডিও ফুটেজ। এমন নৃশংস ঘটনা দেখে রাস্তায় নেমে আসে মিনিসোটা অঙ্গরাজ্যের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। তাদের কণ্ঠে প্রতিবাদী স্লোগান আই কান্ট ব্রিদ। ভিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগে উত্তাল হয়ে ওঠেছে মিনিসোটা অঙ্গরাজ্য। ক্রমে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জলেস, শিকাগো, ডেনভার, ফিনিক্স ও মেমফিয়ের মতো বড়ো বড়ো শহরে। নামানো হয়েছে ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে পুলিশ। রাবার বুলেটে আহত হয়েছে শত শত সাধারণ মানুষ যা ওয়াশিংটনের কলঙ্ক জনক একটি অধ্যায়। বিক্ষুব্ধ জনতাকে উসকানি দেয় টাম্পের ফ্যাসিবাদী মন্তব্য। হোয়াইট হাউসের সামনে জমায়ত হওয়া আফ্রিকান আমেরিকাদের ওপর হিংস্র কুকুর ও ভয়ঙ্কর অস্ত্র প্রয়োগের হুমকি দেন। এতেই যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পরিস্থিতি প্রকট হয়ে ওঠে। অন্য দিকে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ওয়াশিংটনে মৃত্যুর মিছিল বয়ে চলেছে। কিন্তু টাম্প প্রশাসন উহা প্রতিরোধ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একদিকে বিক্ষোভ মিছিল অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যা নির্বাচন পূর্বে টাম্পের জন্য অগ্নি পরীক্ষা স্বরূপ।

আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, “মহামারী ও অর্থনীতির সংকটে আমরা ব্যতিব্যস্ত, তবে মনে রাখতে হবে লক্ষ লক্ষ আমেরিকানকে স্রেফ বর্ণের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। এটা ট্র্যাজেডি ও বেদনাদায়ক। স্বাস্থ্য পরিষেবা, অপরাধী বিচার, রাস্তায় জগিং করা কিংবা পার্কে বসে থাকা- সর্বত্র এই বিভাজন দেখা যাচ্ছ। ফ্লোয়েডের মতো আরেক কৃষ্ণাঙ্গ এরিক গার্নারকে পুলিশ ২০১৪ সালে ২৭ জুলাই নিউইয়র্কে দম বন্ধ করে হত্যা করে। খুচরা সিগারেট অবৈধভাবে বিক্রয় করেছে এই সন্দেহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুধুমাত্র বর্ণের ভিত্তিতে পুলিশের বিরূপ আচারণে প্রতি বছর শত শত কৃষ্ণাঙ্গকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে ।

ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্রের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে আমেরিকয় পুলিশের গুলিতে মারা গেছে ১০১৪ জন তাদের মধ্যে সাবার্ধিক কৃষ্ণাঙ্গ। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারী সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে আমেরিকয় পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তিনগুণ বেশি মারা যায় কৃষ্ণাঙ্গরা। এ থেকে স্পষ্ট যে অত্যাধুনিক যুগেও আমেরিকায় বর্ণবাদ প্রথা কতটা ভয়ানক। বর্ণবাদী নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আমেরিকয় কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ে” সিভিল রাইটস মুভমেন্ট ” গড়ে তোলেন। তিনি ১৯৬৩ সালে ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে লাখ লাখ জনতার সামনে তাঁর বিখ্যাত ভাষণ “আই হ্যাভ এ ড্রিম ” প্রদান করেন। এটি কালোদের রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের সনদ হিসাবে গুরুত্ব বহন করে। তবে কৃষ্ণাঙ্গদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা স্বকৃতি দিলেও কখনো কালোদের মন থেকে মানতে পারেনি শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়। তাই মার্কিন সমাজে পই পই করে বর্ণ বৈষম্য স্ফীত হচ্ছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন সমাজে যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচার না করে শুধু মাত্র মানুষকে বর্ণের ভিত্তিতে বিচার করা নিতান্ত বোকামি ।

লেখকঃ মোঃ বিপ্লব আলী
শিক্ষার্থী,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email