শনিবার, ১১ই জুলাই ২০২০ ইং, ২৭শে আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
আত্মহত্যা একটি মানসিক ব্যাধি
জুন ১৫, ২০২০
আত্মহত্যা একটি মানসিক ব্যাধি

মানুষের জীবনটা খুব ক্ষণস্থায়ী। এই অল্প সময়ে খুব কম মানুষই তার জীবনটাকে উপভোগ করতে পারে কারণ জীবনটাকে উপভোগ করার জন্য মানুষের হাতে সময় অনেক কম থাকে। বৈচিত্র্যময় এই জীবনে উত্থান – পতন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মানুষ তার ভালো সময়গুলো হয়তো ভালোভাবে উপভোগ করতে পারলেও খারাপ সময়গুলো যখন কারো সাথে শেয়ার করতে পারেনা তখন মানুষের মনের ভিতরে সৃষ্টি হয় বিষণ্নতা, একাকিত্ব, মানসিক হতাশা যার ফলে মানুষটি আত্মহত্যার মতো একটি কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হন।

একজন মানুষের আত্মহত্যা করার পিছনে লুকায়িত থাকে অনেক কারণ।যার মধ্যে রয়েছে মানসিক অশান্তি, পারিবারিক কলহ, হতাশাগ্রস্ত,মাদক গ্রহণ,যৌন নির্যাতন, প্রেম কলহ, পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট, একাকিত্বসহ আরো অনেক কারণ। আত্মহত্যা বর্তমানে মহামারীর আকার ধারণ করছে। প্রতিনিয়তই বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। পরিসংখ্যানে দেখা যায় প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় আত্মহত্যা করে। বিশেষ করে কিশোর – কিশোরী যাদের বয়স ৩৫ বা তার নিচে তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। নারীদের তুলনায় পুরুষদের আত্মহত্যার হার ৩-৪ গুন বেশী। একজন মানুষের আত্মহত্যা করার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মানসিক বিষন্নতা। তাই আত্মহত্যা কমানোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জোর দিতে হবে।

সুখ – দুঃখের মিশ্রণেই মানুষের জীবন। আর প্রতিনিয়তই অামরা যুদ্ধ করে চলেছি এই জীবনের সাথে। মানুষ তার জীবনের সাথে বার বার হার মানলেও আবার উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছে যারা জীবনের কাছে হেরে যাওয়া সহ্য করতে পারেনা। তাই তারা নিজের অমূল্য জীবনটাকে বিসর্জন দিয়ে ফেলে। আত্মহত্যা করা মানুষের চিন্তা – ভাবনা কেমন হয়। কী সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যার ফলে একজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যারা আত্মহত্যা করে তারা আসলে চায় না মৃত্যুবরণ করতে তারা চায় নিজের জীবনযাপন বন্ধ করে দিতে। যদি এমন কোনো উপায় থাকতো যেখানে জীবনযাপন করতে হবেনা আবার মৃত্যুও হবেনা তবে সেই মানুষগুলো ওই মধ্যপন্থাই বেছে নিতো। কিন্তু আত্মহত্যার কথা চিন্তা করা মানুষগুলো কারো সাথে তাদের মনের অনুভুতিগুলো শেয়ার করতে চায় না তারা নিজের মনের ভিতরে কষ্ট লুকিয়ে রেখে বাহ্যিকভাবে সুখীবেশে চলাফেরা করে। ফলে কেউ বুঝতে পারেনা তার মনের ভিতরে কী চলছে। মানসিক বিষন্নতা মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। তাই যখন কোনো ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তখন আমাদের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো তার মনের অবস্থা জানতে চাওয়া, তাকে সাপোর্ট করা। মানসিক বিষন্নতা একটি ভয়াভয় ব্যাধি যা মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

মানুষের আবেগ অনেক ভয়ানক একটা জিনিস । কারণ মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এজন্য মানুষের উচিত নিজের আবেগ- অনুভূতিগুলো নিজের মনের মধ্যে জমিয়ে না রেখে অন্যের সাথে শেয়ার করা। তাহলেই মানুষের মনটা হালকা হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ যদি তা না করে নিজের মনের ভিতরেই আবেগ লুকিয়ে রাখে তখন সেই আবেগ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় যার ফলে সে আত্নহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আমাদের আশে- পাশে যারা বিভিন্ন ধরণের ডিপ্রেশনে ভুগছেন আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ডিপ্রেশনের কারণ জানতে চাওয়া, প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা করা এবং তাদেরকে মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা। এতে করে আত্নহত্যার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবা। তাছাড়া আত্নহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন, ধর্মীয় অনুশাসন, প্রিয়জনের সান্নিধ্য, মানসিক দৃঢ়তা প্রভৃতি বিষয়গুলো অনেক কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আত্মহত্যাকারী ব্যক্তিদের মধ্যে বেশীরভাগ মানুষই তরুণ। বিভিন্ন মানসিক অশান্তির জের ধরে তারা আত্নহত্যা নামক ভয়ংকর ব্যাধি বেছে নেয়। তাই বিশ্বের তরুণ সমাজকে আত্মহত্যানামক ব্যাধি থেকে দূরে থাকার জন্য সচেতন করা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্পর্কে করণীয় অবহিত করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। পরিশেষে আমরা চাই, মানুষ তার জীবনে মানসিক বিষন্নতাগুলো কাটিয়ে উঠে আত্মহত্যা নামক ভয়কে জয় করতে পারবে এবং একটি সুস্থ – সু্ন্দর জীবনযাপনে সক্ষম হবে।

লেখকঃ সাইফুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email