বৃহস্পতিবার, ৩০শে জানুয়ারি ২০২০ ইং, ১৭ই মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
আমিই সব!
জানুয়ারি ১২, ২০২০
আমিই সব!

আমি একজন ডাক্তার। কি অবাক হলেন! আমি কেমনে ডাক্তার হলাম? হ্যাঁ আমি একজন ডাক্তার। যখন আমার কাছে কেই এসে বলে আমার ভীষণ খারাপ লাগতেছে আমি এখন কি করব? আমার তো গ্যাসে দেহ চলতেছে না, আমি কি করলে গ্যাস কমবে? প্রচন্ড মাথা ব্যথায় একদম শেষ হয়ে যাচ্ছি, কি করব একটু বলে দিন ভাই? গতকাল থেকে পাতলা পায়খানায় শরীর একদম নাজেহাল অবস্থা, কি করব বলে দিন একটু? আমি তো জানি এগুলো হলে কি করতে হয়। আমি তাদেরকে সব বলে দেই, তারা আমার কথা মত ঔষধ সেবন করে। অনেকেই এরকম আমার কাছে থেকে শুনে নিয়ে ঔষধ সেবন করে। অনুরূপভাবে ডাক্তারের কাছে থেকেও এরকম শুনে নিয়ে অনেকেই ঔষধ সেবন করে। সেই বিচারে আমি কিন্তু একজন ডাক্তার।

আমি একজন রুগী। এইমাত্র বললাম আমি একজন ডাক্তার আবার এখন বলছি আমি একজন রুগী। বিষয়টা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে তাই না! আসলেই আমিএকজন রুগী। আমি যখন ঔষধ আনার জন্যে কোনো হাসপাতালে যাই তখন হাসপাতালের ডাক্তার কিংবা নার্সরা বলে একটা রুগী আসছে ঔষধ নিতে। তাহলে কি দাড়াল, আমাকে রুগী বলে সম্বোধন করল। সুতরাং আমি একজন রুগী।

আমি কিন্তু একজন ছাত্র। মিথ্যা বলছি না কিন্তু। যা বলছি সবই একদম সত্য। আমি যখন ক্লাস করার জন্যে ডিপার্টমেন্টে যাই কিংবা স্কুল, কলেজে যাই তখন আমার পরিচয় কি? অবশ্যই আপনারা বলবেন ছাত্র। কারন ক্লাস করার জন্যে ছাত্র-ছাত্রীরাই স্কুল, কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটিতে যায়। সুতরাং আমি নিঃসন্দেহে একজন ছাত্র।

একথা অনস্বীকার্য যে আমি একজন শিক্ষকও বটে। এই নিজেকে ছাত্র বলে ঘোষণা দিলাম আবার বলছি শিক্ষক! কেমন যেন আমি তাই না? বিশ্বাস করুন আমি একজন শিক্ষক। কতজনকে কতকিছু শিখালাম। এ ভাই, এটা এভাবে করেন, এ ভাই, এটা ওভাবে করেন। শিক্ষকের কাজ কি? আপনারা বলবেন শিক্ষা দেওয়া। আমি তো অনেক কেই অনেক কিছু শিখিয়েছি। তাহলে আমাকে শিক্ষক কেন বলা যাবে না? অন্যথায় আমি একটি কোচিং এ পড়াই, হোম টিউশন করাই।যখন পড়াতে যাই তখন আমাকে সবাই স্যার বলে সম্বোধন করে। যাকে স্যার বলে সে অবশ্যই শিক্ষক। অতএব আমি একজন শিক্ষক।

আমি কি নিজেকে ড্রাইভার বলে সম্বোধন করতে পারি না? এবার মনে হয় আপনারা নির্ঘাত আমায় পাগল বলে ফেলবেন! ড্রাইভার কেমনে হলাম আমি। আমি তো গাড়ি চালাই। কখনও ভ্যান কখনও বাই-সাইকেল ইত্যাদি। আর যে বা যারা গাড়ি চালায় তাদেরকে সবাই ড্রাইভারই বলে থাকে। কেউ চালায় বড় গাড়ি, কেউ ছোট গাড়ি, কেউ বাস, কেউ ট্রাক, কেউ চালায় লড়ি। তারা প্রত্যেকেই একেকজন ড্রাইভার। গাড়ি ছোট হোক বড় হোক সেটা বিষয় না। বিষয়টা হল গাড়ি চালায় কি না। যে গাড়ি চালায় সেই চালক। এর মধ্যে কেউ তিন নাম্বার হাত প্রবেশ করাতে পারবে না। আপনাদের পক্ষে হোক আর বিপক্ষে হোক কথা একটাই আমি কিন্তু একজন ড্রাইভার।

ভুল করে বলি আর মাতাল হয়ে বলি আমি একজন যাত্রী। তাতে আমাকে যে যাই ভাবুক আর যে যাই বলুক আমার কিচ্ছু করার নেই। আমি যেটা সেটা আমাকে বলতেই হবে। আমি আবার যাত্রী হলাম কেমনে? আমি তো আর সব সময় বাড়ি বসে থাকি না। একটু না একটু বাইরে ঘোরাফিরা করি। বাইরে বের হলেই গাড়িতে উঠতে হয়। আমি যখন গাড়িতে উঠি তখন ড্রাইভার, কন্ট্রাক্টার এবং হেল্পার আমায় কি বলবে? যাত্রী ছাড়া কিছু বলতে পারবে? বলতে পারলেও তাদের কাছে আমি যাত্রী ছাড়া আর কিছু না। তারা বলে বাসে যাত্রী উঠাতে হবে। বাসে যাত্রী সংখ্যা কম হলে বলে যাত্রী কম আর যাত্রী সংখ্যা বেশি হলে বলে যাত্রী বেশি। এক্ষেত্রে আমার পরিচয় এবার আপনারা কি দিবেন? আপনারা যাই দিন আমার পরিচয় আমাকেই দিতে হবে। আমি একজন যাত্রী।

আমি পাঁয়ে জুতা পড়ি। জুতা অনেক সময় ছিড়ে যায়, খুলে যায়, রঙ উঠে যায়। তখন মাঝে মাঝে নিজেই নিজের জুতা সেলাই করি, রঙ করি। জুতা সেলাই করা, রঙ করা কার কাজ? এগুলো তো মুচির কাজ। মুচিই এগুলো করে। আরএই কাজ যদি আমি করি তাহলে আমাকে কি বলা যাবে? মুচির কাজ আমি করলে আমিও মুচি।

আমি পথিক হলে কেমন হয়? পথিক! এ আবার কি? অনেক কিছুই তো হলাম এবার নিজেকে পথিক বলে দাবি করলে কেমন হয়? আমি রাস্তায় চলতে গেলে অনেক সময় নিজ পাঁয়ে হেঁটে চলি। একস্থান থেকে অনস্থানে যেতে হলে আমি রাস্তা ব্যবহার করি। আর রাস্তায় যারা হেঁটে দুর থেকে বহুদুরে যায় তাদের আমরা রাস্তার পথিক বলে সম্বোধন করি। তাহলে আমি কেন পথিক হব না?নিঃসন্দেহে আমি একজন আগন্তুক পথিক।

যারা ফ্যান, ঘরের লাইট, সুইচ, রাইচ কুকার মেরামত করে এবং অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স এর কাজ করে তাদেরকে আমরা ইলেক্ট্রিশিয়ান বলে থাকি। আর আমি যদি এইকাজ করি তাহলে আমাকে কি বলা হবে? বাড়িতে অনেক সময় বাল্ব, ফ্যান, সুইচ বোর্ড নষ্ট হয়ে গেলে আমি নিজে মেরামত করি। আমাকে কেন ইলেক্ট্রিশায়ান বলা যাবে না? নিজের দাবি আমি নিজেই পূরন করে নিলাম। আমি একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান ঠিকআছে।

আমি তো একজন শ্রোতাও। কি শ্রোতা হতে পারি কিনা? আমি অনেক সময় গান শুনি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাই। দর্শক সাড়িতে বসে থাকি। আর যারা মঞ্চে বসে থাকে বা মঞ্চে বিভিন্ন কথাবার্তা বলে তখন তাদের সামনে যারা বসে থাকে তাদেরকে শ্রোতা বলা হয়। আমি তো অনেক সময় সামনে বসে থাকি। তাহলে আমি কি? হ্যাঁ, অবশ্যই আমি একজন শ্রোতা তাতে যে যাই বলুক না কেন। নিজের পরিচয় নিজেকে দিতে কোনো প্রকার কার্পণ্য করতে দ্বিধাবোধ করি না আমি।

বেঁচে থাকার জন্যে আমাকে নানান সময় নানান জিনিস কিনতে হয়। আর তা কেনার জন্যে আমাকে বাজারে যেতে হয়। আমি যখন কোনো দোকানের সামনে গিয়ে দাড়াই তখন দোকানদার আমাকে ক্রেতা ভাবে। সে ভাবে আমার দোকানে একজন ক্রেতা আসছে। পরিচয়টা আমার কি দাড়ায় এবার? নিশ্চয়ই আপনারা বলবেন ক্রেতা। অবশ্যই বলবেন। ক্রেতাকে ক্রেতা বলবেন নাতো কি বলবেন। কারন আমিতো একজন ক্রেতা।
মসজিদে যারা নামাজ পড়তে যায় তাদেরকে মুক্তাদি বলা হয়। আমি যে একজন মুসলিম। আমিও তো নামাজ পড়ি। তাহলে আমিও একজন মুক্তাদি। এখানেআমার পরিচয়ে বাধা দেওয়ার কে আছে? আমি কারও চাচা, কারও ভাই, কারও মামা। আমি কি না সেটাই জানি না। আমি যখন যা করি তখন আমি তাই। আমি অনেক সময় অনেক কিছু করি, সুতরাং আমি অনেক সময় অনেক কিছুই হই। আমি না বদলালেও আমার কাজ আমাকে বদলে দেয়। আমি যে মানব সে মানবই থাকি।

 লেখকঃ মেহেদী হাসান
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email