মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৪ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
আল কুরআনে ইসলামী সাংবাদিকতার মূলনীতি
জুন ২৩, ২০২০,  ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আল কুরআনে ইসলামী সাংবাদিকতার মূলনীতি

আল কুরআনে উল্লিখিত হুদহুদের এ ঘটনায় সাংবাদিকতার উপাদান যেমন ‎রয়েছে তেমনি তাতে সাংবাদিকতার ইসলামি মূলনীতিগুলোও রয়েছে। তা ‎সংক্ষেপে এভাবে আলোচনা করা যায়:‎

‎১. খবরে নতুন কিছু থাকতে হবে। সংবাদ বিশেষজ্ঞরা বলেন খবরে অবশ্যই ‎এমন কিছু নতুনত্ব থাকতে হবে যা পাঠকের এবং শ্রোতার কাছে নতুন বলে ‎মনে হবে। না হয় সেটি কোনো খবর বলেই গণ্য হবে না। আল কুরআন এ ‎গল্পে এ বিষটিأَحَطتُ بِمَا لَمۡ تُحِطۡ بِهِۦ ‏‎ ‘আমি যা অবগত হয়েছি আপনি তা ‎অবগত নন’ বাক্যের মাধ্যমে প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে সাব্যস্ত করেছে। কারণ ‎হুদহুদের কাছে যে সংবাদটি ছিল সেটি সোলাইমান আ. জানতেন না; তাই তাঁর ‎কাছে খবরটি নতুন ছিল।‎

‎২. খবরটি নির্ভরযোগ্য কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। অর্থাৎ খবরটি ‎অবশ্যই সত্য ও নির্ভরযোগ্য হতে হবে। এ কারণেই হুদহুদ বলেছেন আমি ‎আপনার কাছে একটি সংবাদ নিয়ে এসেছি, বরং বলেছেন,‎بِنَبَإٖ يَقِينٍ ‏‎ ‘আমি ‎আপনার জন্য একটি নিশ্চিত খবর নিয়ে এসেছি’। এ বিষয়টিই ইসলামি ‎সাংবাদিকতাকে অন্যান্য হলুদ সাংবাদিকতা থেকে আলাদা করে। এ সাংবাদিকতা ‎মনগড়া খবর ছাপায় না, মনগড়া খবর প্রচার করে না। কেবল শোনার উপর ‎নির্ভর করে সত্যতা যাচাই না করে কোনো সংবাদ প্রচার করে না। কারণ ‎ইসলাম যে সাংবাদিকতায় মানুষকে ভূয়া খবর দেয়া হয়, মানুষের মাঝে গুজব ‎ছড়ানো হয়, সে ধরনের হলুদ সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে না।‎

‎৩. সংবাদে সমস্যার সমাধানের ইঙ্গিত থাকতে হবে। ইসলামি সাংবাদিকতা ‎এমন কোনো সাংবাদিকতা নয় যাতে কেবল ভুল ত্রুটি ও সমস্যা তুলে ধরা হবে। ‎বরং এ সাংবাদিকতায় সমস্যার ইসলামি সমাধান ও বিকল্প পথের সন্ধানও দেয়া ‎হয়। যেমন এ ঘটনায় দেখা যায় যে, সবা রাজ্যের জনগণ সূর্যের পূজা‎ করছে। ‎আল্লাহর ইবাদত বাদ দিয়ে সূর্যের পূজা‎ করবে এটি কখনো গ্রহণযোগ্য হতে ‎পারে না। যদি এটি গ্রহণযোগ্য না হয়; তবে বিকল্প ব্যবস্থা ও সমাধান কি? ‎হুদহুদ এর সমাধানও পেশ করছে। সে বলেছে ‎أَلَّاۤ يَسۡجُدُواْۤ لِلَّهِ ‏‎ ‘যাতে তারা ‎আল্লাহকে সিজদা না করে’। অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যকে সিজদা করা ‎শয়তানের কাজ; তাই আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা যুক্তিগ্রাহ্য হতে ‎পারে না।‎

‎৪. সংবাদ দলিল প্রমাণ নির্ভর হতে হবে। অর্থাৎ খবর দিলল প্রমাণ নির্ভর ও ‎যুক্তি গ্রাহ্য হতে হবে। অতএব ইসলামি সাংবাদিকতা হল দলিল প্রমাণ ও ‎যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতা। কারণ হুদহুদকে দেখা যায় যে সে সাবা ‎রাজ্যে শাসন রীতির সমালোচনা করেছে। তাদের সামনে তাদের ভুল ভ্রান্তি তুলে ‎ধরেছে তারপর তাদের সামনে বিশ্লেষণধর্মী সমাধানও পেশ করেছে। এ প্রসঙ্গে ‎‎সে বলেছে সূর্যকে সিজদা করা একটি ভুল কর্ম। অতএব আল্লাহকে ছাড়া আর ‎কাউকে সিজদা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ আল্লাহ হলেন তিনি ‎يُخۡرِجُ ٱلۡخَبۡءَ فِي ‏ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَيَعۡلَمُ مَا تُخۡفُونَ وَمَا تُعۡلِنُونَ ٢٥ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ‏ٱلۡعَظِيمِ۩ ‏‎ ‘যিনি আসমান ও যমীনের লুকায়িত বস্তুকে বের করেন। আর তোমরা ‎যা গোপন কর এবং তোমরা যা প্রকাশ কর তিনি সবই জানেন। আল্লাহ ছাড়া ‎সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই। তিনি মহান আরশের রব।’

‎৫. সকলের সমালোচনা সমানভাবে করতে হবে। ইসলামি সাংবাদিকতা কোনো ‎‎নেতা বা কোনো সর্কার প্রধান যে রকম ক্ষমতাবান ও মর্যাদাবান হোক না কেন ‎কাউকে সমালোচনার উপরে মনে করে না। সাংবাদিক হুদহুদ কোনো নিন্দুক বা ‎‎কোনো সমালোচকের সমালোচনাকে ভয় না করে সাবার রাণীর গঠনমূলক ‎সমালোচনা করেছে। তার নিজের এবং তার জাতির আকিদার ভ্রান্তির সমালোচনা ‎করেছে। তার মতে তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে আকিদাগত; তারা আল্লাহকে বাদ ‎দিয়ে সূর্যকে সিজদা করার মতো শিরকি কাজে জড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া তারা ‎অপব্যয় ও অপচয়ের মতো বিলাসিতার কাজেও নিমজ্জিত। এ দিকে ইঙ্গিত করে ‎বলেছে,‎وَلَهَا عَرۡشٌ عَظِيمٞ ‏‎ ‘আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন’।‎

‎৬. মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকতা। ইসলামি সাংবাদিকতা মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতা। ‎‎তেমনিভাবে ইসলামি সাংবাদিকও কার্যত মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিক। সে ঘটনা ‎অকুস্থানে গিয়ে নিজের চোখে দেখে নিজের কানে সব কিছু শুনে তার পরে ‎রির্পোট তৈরি করে। সম্প্রতিকালের একজন ইউরোপীয় সংবাদ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‎‘এমন একদিন আসবে যে দিন যারা না দেখে রিপোর্ট লিখবে তাদের কলম থেকে ‎বজ্রপাৎ হবে’। সম্ভভ এই ইউরোপীয় সংবাদ বিশেষজ্ঞ এ বিষয়টি হুদহুদের কাছ ‎‎থেকে লাভ করেছিল। মুসলিম সাংবাদিক অকুস্থানে না গিয়ে, নিজের চোখে সব ‎কিছু না দেখে, ঘটনার প্রেক্ষাপট না জেনে, বাস্তবতা উপলব্ধি না করে, টেবিলে ‎বসে মনগড়া সংবাদ লিখতে পারে না। কারণ এ ধরনের সাংবাদিকতা বাস্তবসম্মত ‎নয়। এ ধরনের সাংবাদিকতায় সত্য ও বাস্তবতার ব্যত্যয় ঘটে। আমানতের ‎‎খেয়ানত হয়। একারণেই আমরা দেখতে পাই যে, হুদহুদ সংবাদটি নিজের ‎দিকে সম্পৃক্ত করেছে। সে বলেছে, ‘আমি এক নারীকে দেখেছি,। সে এ সংবাদ ‎অন্য কোনো পাখীর কাছ থেকে শুনে বলেনি।‎

এসবই হচ্ছে ইসলামি সাংবাদিকতার মূলনীতি। আল কুরআন এসব মূলনীতির ‎আলোচনা এ জন্যই করেছে যাতে সাংবাদিকদের সামনে সাবাদিকতার রাস্তা ‎আলোকিত হয়, তারা তা থেকে শৈল্পিক ও চিন্তাগত সহযোগিতা লাভ করতে ‎পারে। আর তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের পেশা চালিয়ে যেতে পারে। অতএব ‎একজন মুসলিম সাংবাদিককে তা মেনে চলতে হবে। তার পেশাগত কাজে এ ‎শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে।‎

প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান
অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন