বুধবার, ১৪ই এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১লা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
ইসলামে প্রাণীর মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরির হুকুম ‎
প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান
নভেম্বর ২৫, ২০২০,  ১২:৩৭ অপরাহ্ণ
ইসলামে প্রাণীর মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরির হুকুম ‎

আলেমদের ঐক্যমত প্রতিষ্টিত অভিমত হল ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি তৈরি করা ‎এবং তার বেচাকেনা করা হারাম। এমনকি কোনো অমুসলিমের কাছে বিক্রি ‎করার জন্য মূর্তি তৈরি করাও হারাম। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। ‎‎তেমনিভাবে মাঠে-ময়দানে বাগানে-পার্কে রাস্তা-ঘাটে মূর্তি স্থাপন করাও হারাম। ‎তা পূজা‎র উদ্দেশ্যে তৈরি করা হোক বা সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে কিংবা ‎মানুষের কাছে তার স্মৃতি জাগরূক রাখার জন্য হোক। এমন কি রাস্তা-ঘাট, বা ‎বাড়ি ঘরের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য হলেও হারাম। কারণ ইসলাম ধর্ম হল ‎তাওহিদের ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে শিরকের চেয়ে বড় কোনো গুনাহ নাই। এ ‎কারণেই ইসলাম পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, কঠোর ভাষায় ‎‎পৌত্তলিকতার নিন্দা করেছে। ইসলাম মূর্তি পূজা‎র কঠোর বিরোধীতা করেছে। ‎ইসলাম মূর্তি তৈরিরও বিরোধীতা করেছে। কারণ মূর্তি মানুষকে ধীরে ধীরে মূর্তি ‎পূজা‎ বা পৌত্তলিকতার দিকে ধাবিত করে। অতীতের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠি মূর্তি ‎তৈরির মাধ্যমেই মূর্তি পুঁজকে পরিণত হয়েছিল। ‎

‘ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, আল্লাহর বাণী
‎ ‎‏﴿وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا ٢٣ ‏وَقَدۡ أَضَلُّواْ كَثِيرٗاۖ﴾ [نوح: ٢٣، ٢٤] ‏
‎(‘আর তারা বলে, ‘তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ‎ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক ও নাসর-কে’। ‘বস্তুত তারা অনেককে পথভ্রষ্ট ‎করেছে।’) আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে এ গুলো নূহ আ এর কাওমের কিছু ‎‎লোকের নাম। এরা মারা যাবার পর শয়তান তাদের উত্তরসুরীদের-কে এ মর্মে ‎প্ররোচিত করে যে, তাদের বসার স্থানে তোমারা তাদের মূর্তি তৈরি করে রাখ। ‎আর সে মূর্তিগুলোর তাদের নিজেদের নামে নাম রাখো। তখন তারা তাই ‎করল। তখনও এ মূর্তিগুলোর পূজা‎ করা হত না। অতপর এসব লোকেরা যখন ‎মারা গেল আর পরের লোকেরা সেগুলোর জ্ঞান হারিয়ে ফেলল; তখন মানুষ সে ‎মূর্তিগুলোর পূজা‎ করতে আরম্ভ করল।‎ [ ‎ বুখারি, কিতাবুত তাফসির, বাবু ওয়ালা সুয়ায়ান ওয়ালা ইয়াগুছান ওয়ালা ইয়ায়ুছান, ‎‎(ফাতহুলবারী) খ.৬, পৃ.১৬০. হা:৪৯২০‎] এ গল্প প্রমাণ করে যে, আল্লাহকে বাদ ‎দিয়ে মানুষের মুর্তি পুজা করার কারণ হল সেই নেতা নেতৃদের মূর্তি।‎

আল কুরআনে ইব্রাহিম আ. এর কাওমের মধ্য হতে যারা মূর্তির পূজা‎ করত ‎তাদের কঠোর নিন্দা করে বলা হয়,‎
‏﴿ وَلَقَدۡ ءَاتَيۡنَآ إِبۡرَٰهِيمَ رُشۡدَهُۥ مِن قَبۡلُ وَكُنَّا بِهِۦ عَٰلِمِينَ ٥١ إِذۡ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦ مَا ‏هَٰذِهِ ٱلتَّمَاثِيلُ ٱلَّتِيٓ أَنتُمۡ لَهَا عَٰكِفُونَ ٥٢ قَالُواْ وَجَدۡنَآ ءَابَآءَنَا لَهَا عَٰبِدِينَ ٥٣ قَالَ لَقَدۡ ‏كُنتُمۡ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُكُمۡ فِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٥٤ قَالُوٓاْ أَجِئۡتَنَا بِٱلۡحَقِّ أَمۡ أَنتَ مِنَ ٱللَّٰعِبِينَ ٥٥ ‏قَالَ بَل رَّبُّكُمۡ رَبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا۠ عَلَىٰ ذَٰلِكُم مِّنَ ٱلشَّٰهِدِينَ ‏‏٥٦ وَتَٱللَّهِ لَأَكِيدَنَّ أَصۡنَٰمَكُم بَعۡدَ أَن تُوَلُّواْ مُدۡبِرِينَ ٥٧ فَجَعَلَهُمۡ جُذَٰذًا إِلَّا كَبِيرٗا ‏لَّهُمۡ لَعَلَّهُمۡ إِلَيۡهِ يَرۡجِعُونَ ٥٨ قَالُواْ مَن فَعَلَ هَٰذَا بِ‍َٔالِهَتِنَآ إِنَّهُۥ لَمِنَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥٩ ﴾ ‏‏[الانبياء: ٥١، ٥٩] ‏

‘আর আমি ইতঃপুর্বে ইব্রাহিমকে সঠিক পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার ‎সম্পর্কে ছিলাম সম্যক অবগত। যখন সে তার পিতা ও তার কাওমকে বলল এ ‎মূর্তিগুলো কি যে গুলোর পূজা‎য় তোমরা রত আছ? তারা বলল আমরা আমাদের ‎পূর্ব পুরুষদেরকে এদের পূজা‎ করতে দেখেছি। সে বলল তোমরা নিজেরা এবং ‎‎তোমাদের পূর্ব পুরুষরা সবই রয়েছে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে। তারা বলল, তুমি কি ‎আমাদের নিকট সত্য নিয়ে এসেছ না কি তুমি খেল তামাশা করছ? সে বলল না ‎বরং তোমাদের রব তো আসমান সমূহ ও যমীনের রব। যিনি এসব কিছু সৃষ্টি ‎করেছেন, আর এ বিষয়ে আমি অন্যতম স্বাক্ষী। আর আল্লাহর কসম তোমরা চলে ‎যাওয়ার পর আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন ‎করব। অতপর সে মূর্তিগুলোকে চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল তাদের বড়টি ছাড়া, যাতে ‎তারা তার দিকে ফিরে আসে। তারা বলল আমাদের দেব-দেবী গুলোর সাথে কে ‎এমনটি করল? নিশ্চয় সে জালিম। [সুরা আম্বিয়া : ৫১-৫৯]‎

আল্লাহ তাআলা যারা দেব-দেবীর মূর্তির পূজা‎ করে তাদের কঠোর নিন্দা করে ‎বলেন,‎
‏﴿ قَالَ أَتَعۡبُدُونَ مَا تَنۡحِتُونَ ٩٥ وَٱللَّهُ خَلَقَكُمۡ وَمَا تَعۡمَلُونَ ٩٦ ﴾ [الصافات: ٩٥، ‏‏٩٦] ‏
‘সে বলল তোমরা নিজেরা খোদাই করে যে গুলো বানাও তোমরা কি সে গুলোর ‎উপাসনা কর? অথচ আল্লাহ তোমাদের কে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি ‎করেছেন।[সুরা আস সাফ্ফাত: ৯৫-৯৬] ‎
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,‎

‏﴿ وَإِبۡرَٰهِيمَ إِذۡ قَالَ لِقَوۡمِهِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱتَّقُوهُۖ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ‏‏١٦ إِنَّمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡثَٰنٗا وَتَخۡلُقُونَ إِفۡكًاۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ ‏لَا يَمۡلِكُونَ لَكُمۡ رِزۡقٗا فَٱبۡتَغُواْ عِندَ ٱللَّهِ ٱلرِّزۡقَ وَٱعۡبُدُوهُ وَٱشۡكُرُواْ لَهُۥٓۖ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ ‏‏١٧ ﴾ [العنكبوت: ١٦، ١٧] ‏
‘আর স্মরণ কর ইব্রাহিমকে যখন সে তার কাওমকে বলেছিল তোমরা আল্লাহর ‎ইবাদত কর এবং তার তাকওয়া অবলম্বন কর; এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। ‎যদি তোমরা জান, তোমরা তো আল্লাহ কে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর পূজা‎ করছ ‎এবং মিথ্যা বানাচ্ছ। নিশ্চয় তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপসনা কর তারা ‎‎তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। তাই আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ কর। তাঁর ‎ইবাদত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তারই কাছে তোমরা ‎প্রত্যাবর্তীত হবে।’[সুরা আল আন কাবুত : ১৬-১৭]-‎

আরও পড়ুনঃ  আল কুরআনে আধুনিক সাংবাদিকতার মৌলিক উপাদান

পূজা‎র উদ্দেশ্যে মূর্তি তৈরি ও মূর্তি পূজা‎ প্রসঙ্গে এটাই হল আল কুরআনের ‎অবস্থান, আর যদি পূজা‎র উদ্দেশ্যে নয়; বরং কারো স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করার জন্য ‎বা কারো প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য মূর্তি তৈরি করা হয়; তা হলেও মূর্তি ‎তৈরি করা হারাম। কারণ তা শিরক তথা মূর্তি পূজা‎র দরজা খুলে দেয়। মানুষকে ‎মূর্তি পূজা‎র দিকে ধাবিত করে।‎

[প্রথম পর্ব]

অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন