রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
ইয়েমেন যুদ্ধে চরম মানবিক বিপর্যয়
অক্টোবর ৬, ২০১৯
ইয়েমেন যুদ্ধে চরম মানবিক বিপর্যয়

বহু প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইয়েমেন। মিশরীয় ও ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী সভ্যতাগুলো গড়ে ওঠার সময় ইয়েমেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি তুরস্কের শোচনীয় পরাজের পর অটোমান সম্রাজের পতন ঘটলে উত্তর ইয়েমেন ১৯১৮ সালে তুরস্কের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। অপরদিকে দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে। অনেক ইতিহাস পেরিয়ে অবশেষে ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হয়। প্রাচীন ইতিহাসের সমৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরপুর দেশটি আজ যুদ্ধের রণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

আরব বসন্তের প্রথম ধাক্কা তিউনিসিয়ার পর ইয়েমেন দীর্ঘ সময়ের একনায়কতন্ত্র শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহ সরকারের পতনের পর মূলত ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হলেও বর্তমান তা বিস্তৃত হয়ে ছায়া যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে এ যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় জোট যার বিপরীত অবস্থানে রয়েছে ইরান,লেবানন ও শিয়া পন্থী কিছু গোষ্ঠী। ইয়েমেন যুদ্ধে চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটছে,যেখানে বিন্দুমাত্র ইয়েমেনবাসীর সহানুভূতির লেশ নেই।

এমনকি হামলা থেকে শেষ রক্ষা পাচ্ছে না হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দাতব্য সংস্থাগুলো। যুদ্ধ কখনোই কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। ডেকে আনে শুধুমাত্র মানবিক বিপর্যয় ও নিরীহ মানুষের হাহাকার। তা জানা সত্ত্বেও বিশ্ব সম্প্রদায় কখনোই যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারি নি। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে কিংবা ক্ষমতার লোভে বা ক্ষমতাকে দীর্ঘ স্থায়ী করার উদ্দ্যেশে জড়িয়ে পরছে যুদ্ধে। যেখানে জীবন দিতে হচ্ছে বা জীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের।যার জ্বলন্ত উদারহণ ইয়েমেন যুদ্ধ। যেখানে প্রতিনিয়ত স্বজনদের কান্না-আহাজারীতে বাতাস ভারী হচ্ছে।

ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে। যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। ইতোমধ্যে আট বছর গত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধে বা সমস্যা সমাধানে বিন্দুমাত্র কোন ইঙ্গিত নেই। অথচ দিন দিন যুদ্ধের আকারও গোলা বারুদের গন্ধ বেড়েই চলছে। যা নিয়ে খুব বেশি মাথা নেই বিশ্বের পরাক্রম দেশগুলোর। বরং যুদ্ধকে উস্কে দিয়ে অস্ত্রের ব্যবসা তারা ভালোই জমিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব।

জাতিসংঘের হিসাব মতো-ইয়েমেন যুদ্ধে ২০১৫ সালে থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ হাজার ৮০০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। যার দুই-তৃতীয়াংশ বেসামরিক নাগরিক। আহত হয়েছেন ১৫,০০০ অধিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাব মতে প্রায় ১০,০০০ লোক নিহত এবং ৬০,০০০ বেশি লোক অাহত হয়েছে। আর বাস্তুচ্যুত হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ। যা মানবিকতার চরম বিপর্যয়। তবে বেসরকারি হিসাব মতে হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেশি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী,ইয়েমেনে বর্তমান ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অনাহারের শিকার। তারা এখন এক বেলা খাবার জোগাড় করতে ব্যর্থ এবং মানবতার জীবনযাপন করছে। গত কয়েক মাস আগে আমাল হোসেন নামে একটি শিশু ক্ষুধায় কাতর হয়ে মারা যাওয়ার ছবি বিশ্ব দেখেছিল। বহু মানুষের চোখের জল এসেছিল এবং বিশ্বের বিবেক স্পন্দন করেছিল। আমালের মতো হাজার শিশু আজ দুর্ভিক্ষের কবলে রয়েছে।

World Health Organization (WHO) এর মতে ইয়েমেনে যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন ধরনের রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। যার মধ্যে কলেরার প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে এই রোগের মহামারিতে ২০০০ অধিক লোক প্রাণ হারায়। বর্তমান প্রায় ১২ লাখ লোক এ রোগে আক্রান্ত। যা আগামীতে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সর্তক করেছে সংস্থাটি। ইয়েমেন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু। তাদের মানসিক উৎকর্ষ সাধন চরম বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আজ  তারা বেড়ে ওঠছে অনাহার ও পুষ্টিহীনতার মাঝে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, দেশটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সি ১৮ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। যেখানে তারা প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে সংগ্রাম করছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে ২০ লাখ শিশু স্কুলে যেতে পারছে না। তারা এখন শিক্ষাগ্রহণের সুবিধা বাইরে। সংস্থাটি আরো জানায়,গত প্রায় তিনবছর ধরে শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছে না এবং মানবতার জীবনযাপন করছে।এতে ৩৭ লাখ শিশুর শিক্ষাজীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। শিশুদের নিয়ে কাজ করা সেভ দ্যা চিলড্রেন সংস্থাটি বলছে-ইয়েমেনে চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে। যা যুক্তরাজ্যের হামিংহাম শহরের পাঁচ বছরের কম বয়সী মোট শিশুর সমান। সুতরাং এ যুদ্ধে নতুন এক প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাব মতে, গত তিন বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ লোক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ছে। অর্ধেকের বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষপীড়িত হওয়ায় দেশটি সবচেয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে বলে সর্তক করেছে জাতিসংঘ।

দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা যুদ্ধে আড়াই হাজারের বেশি স্কুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে শত শত বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিপণী বিতান, হাসপাতাল ও পবিত্র জায়গাগুলো। ইয়েমেনে অর্থনৈতিক পঙ্গু। হাজার হাজার যুবক আজ বেকার, মূল্য স্ফীতি উর্ধ্বগামী।সাধারণ জিনিসের মূল্য নাগালের বাইরে। এমনকি দুর্যোগপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় কয়েক বছর ধরে শীর্ষ আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন।

মানব সভ্যতার পুরনো ইতিহাস,ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর দেশটি আজ গোলা বারুদের ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধার চিৎকার আধুনিক অস্ত্রের কাছে বড় ম্লান। এটাই ইয়েমেনবাসীর জন্য চরম বাস্তবতা। আজ তারা মৃত্যুর কাছাকাছি বাস করছে, অবস্থান দৃষ্টিতে অনেকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জিয়র্ট কাপপেলারকি এই অবস্থাকে জীবন্ত নরক বলে অভিহিত করেছেন। হাজারও শিশুর ক্ষুধার কান্না দেখেও বিশ্ববাসী আজ নিরব দর্শকের ভূমিকায়। এখন প্রশ্ন জাগে বিশ্বের বিবেক জাগবে কবে? ইয়েমেনবাসী  প্রতিদিন গোলা বারুদের গন্ধ ও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ঘুমাতে যাচ্ছে। তারা এটাও জানে না যে, ভোরবেলা নতুন সূর্য দেখতে পারবে কি না?

লেখকঃ মোঃ রাশেদ আহমেদ
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইবি শাখা

Print Friendly, PDF & Email