সোমবার, ৩০শে মার্চ ২০২০ ইং, ১৬ই চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
উচ্চবিত্তের ছোবল
নভেম্বর ২১, ২০১৯
উচ্চবিত্তের ছোবল

দক্ষিণ চট্টলার কোন ঘেঁষে ছোট্ট একটি গ্রাম চুনতি। হিমালয় তুল্য উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে পিজনের বাড়ি। পিজনের মা বাবার দুই জোড়া সন্তানের মাঝে পিজন সবার ছোট। খাটি নিম্নবিত্ত শ্রেণী তার পরিবারে তিন বেলা খাবারের কমতি থাকলেও ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতা কোনো কিছুর অভাব নেই। বয়োবৃদ্ধ পিতা পেশায় দর্জি। সূর্যোদয়- সূর্যাস্ত পর্যন্ত পরিশ্রম করে দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটে কপালে।

পিজন শৈশব কাল থেকে বেড়ে উঠে কৈশোরে এসেও গ্রামের তরু লতার সাথে খেলা করে। পশ্চিমারা বলে এডাল্ট, আর আমরা বয়স সন্ধিকালের কন্যাদের বলি কুমারী। কিশোরী বয়স পার করা পিজনের মায়াবতী চেহারা পূর্ণিমার চাঁদকে হার মানায়। পাড়ার মানুষের কাছে কিশোরী পিজন খুবই প্রিয়। প্রিয় হওয়ার কারণ অবশ্যই তার রূপ যৌবন নয়, জ্ঞান আহরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ছোট্ট বেলা থেকে পিজন অতুলনীয় মেধাবী। পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় টেলেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছে সে। জে এস সি পরীক্ষায়ও জিপিএ 5 পেয়ে গ্রামে সুনাম অর্জন করেছে।

স্কুলের বন্ধু বান্ধবীরা তাকে মজা করে ডাকতো মুরগির ছানা। ঠিক তাইতো! মুরগির ছানার মতোই নিষ্পাপ সাদাসিদে তার মন। স্কুল জীবন ভালই চলছিল। কিন্তু কাল হয়ে দাঁড়ালো গ্রামের বখাটের দল। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে তাকে ইভটিজিং করে এবং প্রেমের প্রস্তাব দেয় বখাটেদের দলনেতা বিনু। ইভটিজিং যেনো পিজনের স্কুল যাত্রার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এভাবে ছ মাস স্কুলে যাওয়ার পর বাধ্য হয়েই পিজনের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয়। বখাটে বিনু তাকে ইভটিজিং এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। চক্ষু লজ্জায় পিজন বেশ কদিন স্কুলে না গেলে তার সহপাঠীরা তার বাড়িতে জানতে আসে! কিন্তু পিজন তাদের কাছ থেকে আসল কথা লুকোয়। তার এই পরিণতির কথা সে কাউকে বলতে চায়না।

সহপাঠীরা প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়, গরীবের আবার পড়ালেখা। দুবেলা ঠিক মত খাবার জোটেনা, তার আবার দেহের অলংকার। আমরা গরীব বলে আমাদের রক্ত মাংসের কোনো দাম নেই এই ঘৃণিত পুরুষ সমাজের কাছে। তারা আমাদেরকে তাদের ভোগের বস্তু মনে করে ভোগ করতে চায়।

পড়ালেখা করে মাথা উঁচু দাঁড়াবার শত আকাঙ্ক্ষা বুকে বাসা বাঁধলেও বখাটে বিনুর নির্লজ্জ পৌরষের কাছে থেমে যায় তার স্বপ্ন। বখাটের সাময়িক আনন্দের কাছে তার ভাগ্য নামের ঘূর্ণায়মান চাকাটি পানচার হয়ে যায়।

এখন পিজন বাড়িতে তার মায়ের সাথে থাকে। পড়াশোনা গত হলো ছ মাস। পিজনের বাবা বলে, পড়াশোনা তো আর হলোনারে মা, একটা ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিতে পারলেই আমি ওপারে গিয়ে শান্তিতে থাকতে পারবো।

একদিন সন্ধ্যায় রফিক ঘটক এসে দরাজায় কড়া নাড়ে! ও পিজনের মা! বাড়িত আছো নি?
দরজার ওপার থেকে পিজনের মা, হ রফিক ঘটক নাকি? আসো আসো!
রফিক ঘটক হাস্যোজ্জ্বল মুখে পানের পিস্কি ফেলে বলে, আজ একখান ভালো ছেলের সম্মন্ধ নিয়েই কিন্তু তোমার বাড়ি আসছি।
ছেলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স পাশ। ভালো বেতনের চাকরি করে, কিন্তু বেসরকারী! বেসরকারী তো কি হয়েছে, বেতন তো অনেক, মেয়ে তোমার সুখেই থাকবে। একবার ভেবে দেখতে পারো।

পিজনের মা একটু ভেবে দেখার সময় নিলো রফিক ঘটকের কাছ থেকে। এক সপ্তাহ পর পাত্রী দেখাতে তারা রাজি হলো। পাত্র পিয়াস আসলো তার আত্মীয় স্বজন সব সাথে নিয়ে পাত্রী দেখতে। পিজনকে দেখেই পিয়াসের মনে একটা ভিন্ন রকম অনুভূতির জন্ম নিলো। হৃদয়ে নব বসন্তের হাওয়া দোলা দিতে লাগলো। মনের অজান্তে পিজনকে সে বরণ করে নিলো।

ঘটক আড়ালে ডেকে নিলেন পিজনের মাকে। বললেন, ছেলে বলেছিলাম না একেবারে চাঁদের মতন, খাটি সোনার টুকরা! আসেন এবার দেনাপাওনার কাজটা সেরে ফেলি।
পিজনের মা বললো: কি কি দিতে হবে?
ঘটক: আরে তেমন কিছু চাওয়া পাওয়া নেই, তবে আপনাদের মেয়ে আর জামাইর জন্য কিছু হালকা পাতলা আর কি!
পিজনের মা: কি কি তাতো বলবেন?
ঘটক: এই ধরুন হান্ড্রেড সিসি একটা মোটর সাইকেল, মেয়ের জন্য একটা ফ্রিজ, আর খাট পালন যা দিবেন মেয়ের থাকার জন্য! আর মেয়ের কান খালি থাকলে কেমন দেখায়, ৫/৬ ভরি স্বর্ণ, আর পাঁচশোর মত বর যাত্রী খাওয়ায় দিলে হবে। আর বেশি কিছু না!
মা: আমাদের তো এত সামর্থ্য নেই। মেয়ের বাপ দর্জি কাজ করে দিনে চার পাঁচশো যা রোজগার করে তা দিয়ে কোনো রকম পেটে পিঠে চলি। এতো কিছু দেওয়ার মতো মন থাকলেও আল্লাহ আমাদের সেই ধন দেননি।

এদিকে পিজন কান্না ভেজা কণ্ঠে তার মাকে বলে, মা আমি ওই বুড়ো ছেলেকে বিয়ে করবো না। দরকার হলে চিরকুমারী থাকবো!
মা সত্যি করে বলোতো, আমি কি তোমাদের জন্য বোঝা হয়ে গেছি? ছোটবেলার আদর কি আমার জন্য আর একটুও অবশিষ্ট নেই?
মা: মেয়ে বড়ো হলে মা বাপের কি চিন্তা সেটা যখন মা হবি তখন বুঝবি!
পিজন: মা,ওমা,,,,, তোমরা ওদেরকে দেওয়ার জন্য এতো টাকা কই পাবে? আমাদের তো ওতো সামর্থ্য নেই!
মা: মা শুন, দরকার হলে ভিক্ষা করে জোগাড় করবো। তোর সুখ যে আমাদের সুখ, আর ছেলেতো ভালোই।
পিজন: চুপি চুপি বলে, ১৬*২=৩২ এই কথা যদি তোমরা বুঝতে! তবে পাঠক এটার মানে সহজে বুঝে নেওয়ার অধিকার রাখে।

পিজন কোনোভাবেই পিয়াসকে মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু ভাগ্যের রশি হয়তো দুজনের হাতে বেঁধে দিয়েছেন বিধাতা। বয়সের তারতম্যের কথা পিজন তার মা বাবাকে বলতে পারছে না। কারণ সে তার মা বাবার মনে কষ্ট দিতে চায়না। এদিকে পিয়াসকেও সে মন থেকে মানতে পারছে না। দোলাচলতার মধ্যেই তার জীবন চলছে।

অবশেষে মা বাবার চোখের জলের দিকে তাকিয়ে সে বিয়েতে রাজি হলো। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার সম্ভাব্য দিনের তিনদিন আগে পিজনের বাড়িতে খবর আসলো ইভটিজিং এর দায়ে বিনুকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই বিনু ঠিক ছয় মাস আগেও ঠিক একইভাবে পিজনকেও ইভটিজিং করে শারীরিক নির্যাতন করেছিল। সেদিন সে কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি। কারণ সে ছিল অসহায়। তার পরিবার ছিল নিঃস্ব। কিন্তু আজ গ্রামের মানুষ প্রতিবাদে জেগে উঠেছে। সে জন্যে বিনুর মত ইভটিজার আজ কারাগারের অন্ধকার নরকে। আর স্বপ্নের দ্বার খুলে গেলো পিজনের।

পিজন তার বিয়ে থেকে সম্মতি তুলে নিলো। সে আবার মনস্থির করলো পড়ালেখা করবে। নিজের পরিবারটাকে আলোকিত করবে। এই অন্ধকার গ্রামটাকে আলোকিত করবে। অন্ধকার এই গুহার মাঝে আলোর প্রদীপ জ্বালাবে। সে পুনরায় ভর্তি হলো একবছর পর নবম শ্রেণীতে। এখন সে গ্রামের অবহলিত নিপীড়িত মানুষের প্রেরণার বাতিঘর। গ্রামের আর আট দশজন নারীরাও এখন পিজনের মত আত্মবিশ্বাসী, প্রতিবাদী, এবং জ্ঞানপিপাসু হতে চায়।

লেখক, শিক্ষার্থী: বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email