রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
এতেকাফঃ তাৎপর্য, উদ্দেশ্য ও বিধান
মে ২৯, ২০১৯
এতেকাফঃ তাৎপর্য, উদ্দেশ্য ও বিধান

রমজানের শেষ দশকের অন্যতম আমল এতেকাফ

রমজানের শেষ দশকের অন্যতম আমল হলো, মসজিদে এতেকাফ করা। মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছর এতেকাফ করেছেন। এতেকাফের অনেক উপকারিতা রয়েছে। এতেকাফের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে। অন্যকে ভালোবাসা এবং ক্ষমা করে দেওয়ার মন-মানসিকতা বৃদ্ধি পায়। এতেকাফে বসে বেশি বেশি কোরআন  তেলাওয়াত ও তাফসির পড়ার সুযোগ হয়। ঐকান্তিকভাবে আত্মসমালোচনা ও তওবা করার সুযোগ হয়। তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়া যায়। দশ দিন দশ রাতে ২৪ ঘণ্টার রুটিন করে পুরো সময়টাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

এতেকাফের উদ্দেশ্যের কয়েকটি হলোঃ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা : আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হওয়া, আল্লাহকেন্দ্রিক ব্যতিব্যস্ততা, অন্তর সংশোধন, ইমানি দৃঢ়তা অর্জন। এতেকাফ হলো এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা সব সৃষ্টি-জীব থেকে আলাদা হয়ে যথাসম্ভব প্রভুর সান্নিধ্যে চলে আসে। বান্দার কাজ হলো তাকে স্মরণ করা, তাকে ভালোবাসা ও তার ইবাদত করা। সর্বদা তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা, এর মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় ও মজবুত হয়।

পাশবিক প্রবণতা এবং অহেতুক কাজ থেকে দূরে থাকাঃ রোজার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের বাঁচিয়ে রাখেন অতিরিক্ত পানাহার ও পশু প্রবৃত্তির বিবিধ প্রয়োগ থেকে। অনুরূপভাবে তিনি এতেকাফের বিধানের মাধ্যমে তাদের বাঁচিয়ে রাখেন অহেতুক কথাবার্তা, মন্দ সংস্পর্শ ও অধিক ঘুম হতে। এতেকাফের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ অর্থে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়ে যায়। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, কোরআন অর্থসহ অধ্যয়ন, তাফসির অধ্যয়ন, জিকির ও দোয়া ইত্যাদি চর্চার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের অফুরন্ত সুযোগে সে নিজেকে পেয়ে যায়।

শবে কদর সন্ধান করাঃ এতেকাফের মাধ্যমে শবে কদর খোঁজ করা হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) মূল উদ্দেশ্য ছিল। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস সে কথারই প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি প্রথম দশকে এতেকাফ করেছি এই (কদর) রজনী খোঁজ করার উদ্দেশে, অতঃপর এতেকাফ করেছি মাঝের দশকে, অতঃপর মাঝ-দশক পেরিয়ে এলাম, তারপর আমাকে বলা হলো, (কদর) তো শেষ দশকে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ এতেকাফ করতে চায় সে যেন এতেকাফ করে, অতঃপর লোকেরা তার সঙ্গে এতেকাফ করল।’ সহিহ মুসলিম

মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলাঃ এতেকাফের মাধ্যমে বান্দার অন্তর মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। হাদিস অনুযায়ী যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহতায়ালা তার নিজের ছায়ার নিচে আশ্রয় দান করবেন তাদের মধ্যে একজন হলেন ওই ব্যক্তি মসজিদের সঙ্গে যার হৃদয় ছিল বাঁধা।

দুনিয়া ত্যাগ ও বিলাসিতা থেকে দূরে থাকাঃ এতেকাফকারী পূর্বে যেসব খারাপ কাজ করত সেসব থেকে সরে এসে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করে ফেলে। এতেকাফ অবস্থায় দুনিয়া ও দুনিয়ার স্বাদ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ইসলাম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং পরবর্তী জীবনে তা কাজে লাগাতে পারে।

এতেকাফে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়ঃ এতেকাফকারী যদি রমজানের শেষ দশকে এতেকাফের নিয়ত করেন তা হলে বিশতম রোজার দিন সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করবেন, কেননা তার উদ্দেশ্য কদরের রাতের সন্ধান করা, যা আশা করা হয়ে থাকে বিজোড় রাত্রগুলোতে, যার মধ্যে একুশের রাতও রয়েছে। তবে এতেকাফ থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে উত্তম হলো চাঁদ রাত্রি মসজিদে অবস্থান করে পরদিন সকালে সরাসরি ঈদগাহে চলে যাওয়া। তবে চাঁদ রাতে সূর্যাস্তের পর মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেও কোনো সমস্যা নেই।

এতেকাফকারী যা মেনে চলবেনঃ এতেকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় তাহলে তার এতেকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর এতেকাফের স্থান থেকে যদি মানবীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য বের হয় তাহলে এতেকাফ ভঙ্গ হবে না। যে মসজিদে এতেকাফে বসেছে সেখানে জুমার নামাজের ব্যবস্থা না থাকলে জুমার নামাজ আদায়ের প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া ওয়াজিব এবং আগেভাগেই রওয়ানা হওয়া তার জন্য মোস্তাহাব। কোনো নেকির কাজ করার জন্য এতেকাফকারীর মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। যেমন রোগী দেখতে যাওয়া, জানাজায় উপস্থিত হওয়া ইত্যাদি।

এতেকাফকারীর জন্য যা অনুমোদিতঃ এতেকাফকারীর জন্য মসজিদে পানাহার ও ঘুমানোর অনুমতি আছে। এ ব্যাপারে সব ইমামদের ঐকমত্য রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত; কেননা আল্লাহর প্রতি একাগ্রচিত্ত এবং একনিষ্ঠভাবে মনোনিবেশের জন্য কম খাওয়া কম ঘুমানো সহায়ক বলে বিবেচিত।

এতেকাফকারী যা থেকে বিরত থাকবেনঃ  প্রয়োজন ছাড়া এতেকাফকারী এমন কোনো কাজ করবে না যা এতেকাফকে ভঙ্গ করে দেয়। ওইসব কাজ যা এতেকাফের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে, যেমনঃ বেশি কথা বলা, অন্যের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করা, অধিক ঘুমানো, ইবাদতের সময়কে কাজে না লাগানো, টেলিফোনে গল্পগুজব করা, বিনা কারণে ইন্টারনেট ব্রাউজ করা, চ্যাটিং করা, মসজিদে অবস্থানরত অন্যদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করা, ঝগড়া-ঝাটি করা, অন্যের গীবত করা ইত্যাদি।

শেখ আব্দুল গফুর, সাতক্ষীরা।

Print Friendly, PDF & Email