সোমবার, ১০ই আগস্ট ২০২০ ইং, ২৬শে শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
ছাত্রজীবনে সেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা
জুলাই ৭, ২০২০,  ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
ছাত্রজীবনে সেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হচ্ছে ছাত্রজীবন। একজন মানুষ তাঁর মনুষত্ব্য বিকাশ ও জীবনকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার শিক্ষা অর্জন করে ছাত্রজীবনে। ছাত্রজীবন হলো জীবন গড়ার উপযুক্ত সময়। তবে ছাত্রজীবনে একজন শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক বইপুস্তকের শিক্ষায় যথেষ্ট নয়। তার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবমুখী সৃজনশীল ধারার শিক্ষা। তাই ছাত্রজীবনে ছাত্ররা যেমন কারিগরি, নৈতিক ও সাধারণ শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা অর্জন করে, তেমনি এই সময় নিজের প্রতিভা, চরিত্র ও মানবিক গুণাবলি বিকাশ করারও যথেষ্ট সুযোগ পায়। তাই প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর উচিত এই সময়টা কাজে লাগানো।

ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করা ছাড়াও আরো কিছু সময় থাকে। সেই সময়গুলো ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, গুগল ও ইউটিউবের পেছনে ব্যয় না করে, কোন সেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে থাকা দরকার। তার মানে এই নয় যে, আমি তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্বকে অস্বীকার করছি। বরং তথ্যপ্রযুক্তির পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন থেকে অর্জিত শিক্ষাগুলো কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছি। কারণ আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের নাগরিক। তারা আদর্শ নাগরিক তখনই হবে, যখন তাদের মধ্যে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তৈরি হবে। তাই আমি মনে করি, ছাত্রজীবনেই শিক্ষার্থীদের মাঝে বাস্তবমুখী কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কেননা আগামী দিনে তারাই দেশকে নেতৃত্ব দেবে। তাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে জাতি। তাই পড়াশোনা করার পাশাপাশি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা, বাস্তব জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও অন্যকে সাহায্য করার প্রবল ইচ্ছা ছাত্রজীবন থেকেই তৈরি করতে হবে।

এরিস্টটল যর্থাথই বলেছেন, “সংগঠন মানুষের নেতিবাচকতা থেকে বেড়িয়ে আসতে সহযোগিতা করে, হতাশা ও দুঃখবোধ থেকে বেড়িয়ে আসতেও মানুষকে সাহায্য করে। চলার পথে একে অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরী করে। জীবনের প্রতি মুহূর্তকে উপভোগ করার পরিস্থিতি ও তৈরী করে দেয় সংগঠন। তবে আমাদের দেশে সাধারণত একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে ‘সেচ্ছাসেবী সংগঠন’ বিষয়টার সঙ্গে পরিচিত হয়। বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে এই সংগঠনগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও একজন শিক্ষার্থীর পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে অনার্স, ডিগ্রি কিংবা সমমান ডিগ্রি অর্জনের সময়। সত্যি বলতে এই সাংগঠনিক কাজগুলো আরো পূর্বে অন্তত কলেজ পর্যায় থেকে হওয়া জরুরি। কারণ সেটা আমাদের সামাজিক প্রগতি আনয়নের পাশাপাশি তরুণ সমাজে সম্প্রীতির নিশ্চয়তা দানে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

স্বেচ্ছাসেবার ধারণা শিশু-কিশোরদের মনে বিদ্যালয় থেকেই বপন করে দেয়া উচিত। বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে উৎসাহিত করলে প্রথম থেকেই সবার মধ্যে সঠিক মনুষত্ব্যের বিকাশ ঘটবে।পরবর্তীকালে তাদের দ্বারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক বেশি কল্যাণ সাধিত হবে। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার বাইরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ধরনের সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই বোধটুকু ছাত্রজীবনে তৈরি করার জন্য সেচ্ছাসেবী সংগঠনই সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম।

সেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলো একটি যেকোনো সংগঠনের মৌল বিষয়গুলোকে ভিত্তি করেই পরিচালিত হয় এবং তাতে গঠনতন্ত্র, পরিচালনা পর্ষদ এবং নিয়ম-নীতিসহ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় থাকে। প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে মানুষ যখন বিধ্বস্ত তখন তাদের পাশে গিয়ে সেবার কোমল হাত প্রসারিত করে দেয় সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। বন্যার্ত, ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত, শীতার্তদের সেবায় তারা গড়ে তুলে সাহায্য তহবিল। আর সে ভান্ডার পূর্ণ করার জন্য স্বেচ্ছাশ্রম দান করতে পারে সমাজের শিক্ষিত ছাত্রসমাজ।

রক্তদানের মধ্য দিয়ে তারা মৃতপ্রায় রোগীকে ফিরিয়ে দেয় প্রাণ। বৃক্ষরোপণে ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য। পল্লীর অবাঞ্ছিত জঙ্গল পরিষ্কার করেও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলে সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। এগুলো একজন শিক্ষার্থীকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বাস্তব জ্ঞান যেমন দিতে পারে আবার টিমওয়ার্ক বিষয়টির সঙ্গেও তাকে পরিচিত করায়। এই টিমওয়ার্ক ধারণা আবার সমাজে সম্প্রীতির নিশ্চয়তা আনয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কিংবা দক্ষ ব্যবস্থাপনা তৈরি করার জন্য টিমওয়ার্ক বিষয়ক শিক্ষা অতীব প্রয়োজনীয়।

সেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার চিরচেনা গণ্ডির বাইরে গিয়ে আরো অনেকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং এতে করে তার বিভিন্ন পর্যায়ের ও ধারার মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয় এবং সর্বোপরি সাংগঠনিক কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে নানা কৌশল শিখতে শিখতে সবার সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধনে সে আবদ্ধ হয়ে যায়। তাই সেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্প্রীতির নিশ্চয়তা প্রদান নিঃসন্দেহে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মঙ্গলজনক। একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন একজন শিক্ষার্থীকে একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি এমন একটি জগতের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয় যেখান থেকে সমাজকে পাঠ করার প্রত্যক্ষ ও যুগোপযোগী পন্থাটা সে পেয়ে যায়। সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন পক্ষ, তাদের আচার-আচরণ ও রীতি-নীতি সম্পর্কে অবগত হওয়ার কারণে তাদের জন্য কার্য সম্পাদনার সময় সে সহনশীলতার পথ অবলম্বন করতে দ্বিধাবোধ করে না এবং তার মধ্যে সহিষ্ণুতার সুযোগও তৈরি হয়। এতে করে শিক্ষাজীবনেই সে সম্প্রীতিময় সম্পর্ক গড়ার উপায় সম্পর্কে শিখে যায়।

অন্যদিকে এই সংগঠনগুলো যেহেতু অনেক সদস্য নিয়ে কাজ করে সেহেতু সদস্যদের আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূলত সেচ্ছাসেবী সংগঠন একটি প্লাটফর্ম হিসেবে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক ভাব ও মত-বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

তাই এক কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে সম্প্রীতি নিশ্চিত করার জন্য সেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা হতে পারে অভিনব এবং তাৎপর্যমণ্ডিত। সমাজের সবচেয়ে তরুণ এবং সচেতন অংশ হচ্ছে ছাত্রসমাজ। পুরাতনকে, মিথ্যাকে, জরা-জীর্ণতাকে মুছে ফেলে, প্রাচীন সংস্কার ও গোঁড়ামিকে ঝেড়ে ফেলে একটি শোষণমুক্ত সুন্দর সমাজ গড়ার দায়িত্ব আজকের ছাত্রদের। ছাত্ররা তাদের সুন্দর মন ও সুকুমার বৃত্তির অভিনব প্রকাশের সাহায্যে সমাজের পঙ্কিলতা দূর করতে পারে। বিশ্ব মানবতা এবং মানবিকতার বিজয় পতাকা ছাত্রদেরই হাতে। তারা তা সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে চিরবঞ্চিত, বুভুক্ষ, অনাহরিক্লিষ্ট মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তারা শোনাতে পারে সান্তনার বাণী। আশাহীন বুকে জাগাতে পারে আশা। ভাষাহীন বুকে দান করতে পারে প্রাণের স্পন্দন।

মোঃ রাশিদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন