শনিবার, ২৮শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
জাতিগঠনে নারী সমাজের ভূমীকা
জুন ১০, ২০২০,  ২:১৬ অপরাহ্ণ
জাতিগঠনে নারী সমাজের ভূমীকা

আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই নারী। জগৎ সংসারে তারা শুধু বধু, মাতা ও কন্যার ভূমীকা পালন করে না, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমায় আজ নারী সমাজ পুরুষের পাশাপাশি সমান যোগ্যতায় অগ্রসর হয়ে চলেছে।

জাতিগঠনে দেশের উন্নয়নে যুগে যুগে নারীরা রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমীকা। ইতিহাস উদঘাটন করলে দেখা যায় সুলতানা রাজিয়া, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাদার তেরেসা, সরোজিনী নাইডু, বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামালের মতো মহীয়সী নারী দেশরক্ষায়, দেশগঠনে, জাতির উন্নয়নে রেখেছেন অসামান্য ও স্বরণীয় অবদান। সে দিনের সেই অভিশপ্ত নারী ঘরের গন্ডি থেকে বের হয়ে আজ নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চায় তার দায়িত্ব ও কর্তব্য ষোলো আনা বজায় রেখে। শিক্ষার বিপুল ভোজে পুরুষের সাথে নারীরাও চায় অংশগ্রহণ করতে।

নারী আজ জয়যাত্রার পথে পা বাড়িয়েছে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালি নারী ছিল অবহেলিত, লাঞ্চিত ও অধিকারবিহীন। সমাজব্যবস্হার প্রতিটি স্তরে নারী ছিল খুবই পশ্চাৎপদ। পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের মানবিকতা ছিল পদদলিত। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার শিকার হয়ে তারা শিক্ষা- দীক্ষা ও মননের উৎকর্ষতায় বহু পিছিয়ে পড়ে।
তাইতো নারী শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো”।

বর্তমানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের অবস্হান ও মানসিকতার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নিজেদেরকে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ না রেখে তারা আজ দেশ ও জাতির উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। দেশের উন্নয়ন কাজের সকল স্তরে তাদের অবাধ বিচরণ লক্ষনীয়। দীর্ঘ দিনের দাসী মনোভাব পরিহার করে তারা যেনো আজ জেগে উঠেছে নতুন উদ্যমে।

একটি দেশ শিক্ষায় যতো এগিয়ে সে দেশ ততো উন্নত ও সমৃদ্ধ। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তারা তাদের দেশের সকল ক্ষেত্রে নারী সমাজকে প্রাধান্য দিয়েছে। বেগম রোকেয়ার প্রচেষ্টায় আমাদের দেশের নারী সমাজের চিত্র কিছুটা পরিবর্তন হলেও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ত্বরান্বিত করেই আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আবহমানকাল ধরে নারীরা পুরুষশাসিত সমাজে অবহেলিত হয়ে পিছিয়ে পড়লেও বর্তমানে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাদের উপস্হিতি লক্ষ করা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরে তারা ছেলেদের পাশাপাশি অবস্হান করছে। সাহিত্য ও গবেষণা কর্মেও নারীদের অবদান প্রশংসনীয়। তাই সহযোগীতার মনোভাব দিয়ে নারী সমাজকে যদি প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ করে গড়ে তোলা যায় তাহলে তারা জাতি গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমীকা রাখতে সক্ষম হবে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে শক্তিশালী করতে বর্তমানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সকল অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করছে। তাদের ভূমীকার ক্ষেত্র যেমন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি ঘরে ও বাইরে তারা আজ কর্মমুখর জীবনের স্বাদ গ্রহণ করছে। অফিস আদালত থেকে শুরু করে জ্ঞান মনীষা ও কর্মশক্তি জীবনের চক্রে তারা দিন দিন আবর্তিত হচ্ছে। তাই নারীর অপরিহার্য ভূমীকার কথা স্বরণ করে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, “বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”

একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশের অভ্যন্তরে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যে ক্ষেত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমীকা পালন করে তা হচ্ছে দেশের সামরিক ক্ষেত্র। বর্তমানে আমাদের দেশে সামরিক ক্ষেত্রে নারী সমাজ সদর্পে পদচারণা করছে। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়েও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমীকা পালন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও নারীরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী,স্পীকার, ও বিরোধী দলের প্রধানও একজন নারী। তাদের সহযোগীতায় দেশ, জাতি ও সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতির অধিকার নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৫২ র ভাষা আন্দোলন, ৬৬, ৬৯ এর মিছিলে অংশগ্রহণ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকালে নারীরা তাদের বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

জাতীয় জীবনে নারী জাতিকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন সাধিত হতে পারেনা। আজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীকে কাজ করতে দেখে মনে হয় নজরুল সার্থক। সেই আদর্শবতী রমণী রোকেয়া সার্থক। নারীশিক্ষার ব্যাপারে অতীতের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে আজ অনেক পরিবর্তন এসেছে। লিঙ্গবৈষম্য বা ক্লাসিফিকেশন অনেক হ্রাস পেয়েছে। একটি আদর্শ জাতি গঠনে নারী সমাজের ভূমীকা অপরিসীম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা জাতিগঠনে ভূমীকা রাখতে পারছেনা পুরুষতান্ত্রিক মন মানসিকতা সামাজিক অপবিশ্যাস ও কুসংস্কার নারীদের আত্নবিকাশের প্রধান অন্তরায়। কুসংস্কারের কারণে তারা নিজের মতামত সাহস করে ব্যক্ত করতে পারেনা। তাদের এ অবস্হা থেকে উত্তরণের ব্যবস্হা করতে নারীরা যদি পুরুষের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে সকলক্ষেত্রে সমানভাবে পদচারণা করে, তবেই দেশ তথা জাতির উন্নতি সম্ভব হবে।

লেখক : শাহরিয়ার বেলাল
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন