সোমবার, ৬ই জুলাই ২০২০ ইং, ২২শে আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
ডাঃ জাফরুল্লাহর মতো অন্যেরা দেশপ্রেমিক হলে দেশটা বদলে যাবে।
জুন ২, ২০২০
ডাঃ জাফরুল্লাহর মতো অন্যেরা দেশপ্রেমিক হলে দেশটা বদলে যাবে।

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামক স্বাস্থ্য বিষয়ক এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

জাফরুল্লাহর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। পরিবারের দশ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণের পর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।

চলমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট করোনাভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী এ ভাইরাস বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশেই হানা দিয়েছে। এর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাদ যায়নি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও।

দিন দিন হুহু করে বেড়েই চলছে বিধ্বংসী করোনা ভাইরাসের তান্ডব লীলা। দেশে করোনা প্রকোপ ঠেকাতে প্রথম থেকেই যে মানুষটি বিভিন্ন তত্ত্ব, গবেষণা,করোনাভাইরাসের ধরণ,চিকিৎসা পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সে মানুষটি হলেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আর সে মানুষটিই এখন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু দেশের এ ক্রান্তিকালে তিনি স্থাপন করেছেন দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

করোনা শনাক্তের পর পরই সুসজ্জিত হাসপাতালে কেবিন বুকড থাকার পরেও তিনি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় অবস্থান করছেন। এ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে উনি বলেন-

সাংবাদিক: “কেবিন বুকড থাকার পরও আপনি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় আছেন কেন?”

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন: – আমি তো ডাক্তার। করোনা রোগ নিয়েও কাজ করছি। আমি জানি, করোনা রোগীর কোন সময় হাসপাতালে যেতে হবে আর কোন সময় বাসায় থাকতে হবে। করোনা শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চলে যেতে হবে— এটি একেবারেই ঠিক নয়।

আমি যদি হাসপাতালে গিয়ে কেবিনে উঠি তাহলে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যাবে যে, শনাক্ত হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চলে যেতে হয়। করোনা রোগীদের জন্যে আমি ভুল বার্তা দিতে চাই না। ফলে, আমার জন্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কেবিন বুকিং দিয়ে রাখা সত্ত্বেও আমি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় আছি। এটাই করোনা রোগের সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি।

সবার ক্ষেত্রে এটাই করা উচিত। এমনিতেই হাসপাতালে জায়গা নেই। যাদের দরকার নেই তারাও যদি হাসপাতালে চলে যাই, তাহলে তো সংকট আরও বাড়বে।

সাংবাদিক : “আপনি প্লাজমা থেরাপি কোথায় নিলেন?”

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী : গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে প্লাজমা থেরাপি নিয়েছি।

সাংবাদিক :”সেখানে প্লাজমা থেরাপির ব্যবস্থা আছে?”

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী :- থাকবে না কেন? আমরা একটা হাসপাতাল বানিয়েছি সেই হাসপাতালে যদি আমাদের নিজেদের চিকিৎসাই করতে না পারি, তাহলে তা থাকারই কোনো অর্থ নেই। যে হাসপাতালে আমরা নিজেদের চিকিৎসা করতে পারব না, সেই হাসপাতাল রাখব কেন? সেই হাসপাতাল তৈরি করব কেন? আমি আমার সব রকমের চিকিৎসা আমাদের হাসপাতালে করি।

আজ থেকে ১৮ বছর আগে যখন আমার চোখের অপারেশন করা দরকার হয়েছিল তখন আমি তা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রেই করিয়েছিলাম। তখন আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য ছিলাম। সেসময় পৃথিবীর যেকোনো দেশে, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশের উন্নত হাসপাতালটিতেও আমি বিনা পয়সায় চোখের অপারেশন করাতে পারতাম। কিন্তু, আমি তা করাইনি। জনগণের মাঝে কখনোই কোনো ভুল তথ্য বা ভুল বার্তা দিতে চাইনি। চোখের অপারেশন আমি আমাদের হাসপাতালেই করিয়েছি এবং বাংলাদেশের মানুষকে বুঝাতে চেয়েছি যে এই অপারেশন বাংলাদেশেও করা যায় এবং তা খুবই মানসম্পন্ন।

প্রায় ১৮ বছর আগে আমি চোখের যে অপারেশন করিয়েছিলাম তা বাংলাদেশের হাসপাতাল তথা আমাদের হাসপাতাল সফলভাবে করেছিল। আজকে পর্যন্ত আমার চোখে কোনো সমস্যা নাই। আমাকে চশমাও ব্যবহার করতে হয় না।

আমার আমেরিকা-ইউরোপের বন্ধুরা অনেকবার উদ্যোগ নিয়ে বলেছে, তুমি চলে আসো। বিনা খরচে আমরা তোমার কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের ব্যবস্থা করবো। আমি রাজি হইনি। কারণ, “আমি একা সুবিধা ভোগ করবো আর বাংলাদেশের সব মানুষ বঞ্চিত থাকবে, তা হতে পারে না। কখনোই না।”
দেশপ্রেমের জলন্ত সংজ্ঞা আমরা এখান থেকেই, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী থেকেই পেয়ে গেলাম।

ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো দেশের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকরা যদি দেশে চিকিৎসা নেয় তাহলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা তথা পুরো স্বাস্থ্য খাত বদলে যাবে। তখন আর চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে, আইসিইউ’র অভাবে,বেডের অভাবে দেশের মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে না।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি,মানসিকতা পরিবর্তনের সময় এসেছে। করোনা আমাদের অনেক কিছুই শেখাচ্ছে, অনেক দিকেই ভাবাচ্ছে। দেশের প্রতিটা মানুষ যার যার অবস্থান থেকে যদি দেশপ্রেমের মশাল জ্বালায় তাহলে সুন্দর এই দেশটা তরতর করে এগিয়ে যাবে। আমরা বিনির্মাণ করতে পারবো কাঙ্ক্ষিত ‘সোনার বাংলা’।

লেখক: ইমরান ইমন
শিক্ষার্থী: ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email