বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলমান, কে হবে বিজয়ী!
জানুয়ারি ১০, ২০২০,  ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলমান, কে হবে বিজয়ী!

চারদিকে রব উঠেছে আজ যুদ্ধ! যুদ্ধ ! হচ্ছে শুরু যুদ্ধ ! আসছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ !  শোনতেই কেমন যেন শিউরে ওঠে শরীর কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধ নতুন করে শুরু করার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। কারণ যুদ্ধ সেই অনেক আগ থেকেই চলমান!

কি! শোনে খুব অবাক হয়েছেন বুঝি? আরে না, অবাক হওার কিছু নাই। জেনে রাখা অবশ্যক, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন এসেছে যুদ্ধ কৌশলেও। তো কথা না বাড়িয়ে চলুন মূল আলোচনায় যাওয়া যাক:-

গত ৮-জুলাই ২০১৮ সনে যখন ওয়াশিংটন জেসিপিওএ (পরমানু চুক্তি-এপ্রিল ২০১৫) থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেয় ঠিক তখন থেকেই এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। এমন সময়ে ইউরিনিয়াম কমানোর বিনিময়ে ইউরোপ ইরানকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা মান্য করতে ইরান বার বার গুরুত্বারোপ করলেও তা পালনে ইউরোপ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। তাই ইরান তাদেরকে তিন মাসের সময়সীমা বেধে দেয় যার মেয়াদ ৮-জুলাই ২০১৯ শে এসে শেষ হয়। ঠিক জুলাইয়ের আট তারিখেই ইরান ইউরিনিয়ামের মাত্রা ৩.৬৭ থেকে বাড়িয়ে নেয়ার ঘোষনা দেয়। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন ওরপে ইহুদিববাদী ইসরাইলের খেলার পুতুল বৃটিশ রয়েল নেবি জাবাল আত তারিক(জিবরালটার) প্রণালি থেকে গ্রেস-১ নামের ইরানি একটি তেলের টেংকার জব্দ করে। জবাবে ১৩-জুলাই ২০১৯ তারিখে ইরানের বিপ্লবি বাহিনীও বৃটিশ তেল টেংকার ‘স্টেনা ইম্পিরো’ কে জব্দ করে তার মধুর প্রতিশোধ নেয়।

ওদিকে, ওয়াশিংটন ও বসে নেই। একের পর এক অবরোধ আরোপ করে তেহরানকে একেবারে কোনঠাঁসা করে ফেলার যেন এক মহোৎসবে মেতে উটেছে। ইরানের প্রায় আট কোটি মানুষের জীন চলার উৎস তৈল সম্পদ। সে তেল রপ্তানি আটকিয়ে, দেশে সংকট সৃষ্টি করে, ইরানে অবস্থানরত পশ্চিমা দোসর ও মিডিয়া ব্যবহার করে, মানুষকে উত্তেজিত করে ইরানের রিজম চ্যাইন্জ করার যে স্বপ্ন ওয়াশিংটন দেখে আসছিল ইরান সে চিন্তাকে মাটির সাথে ধ্বষিয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপটি নেয় গত ১২ মে ২০১৯ সনে, ওমান সাগরে চারটি টেংকার জালিয়ে দেয়ার মাধ্যমে (অভিযোগ)।

সাদা চুলের মালিক মি. ট্রাম্প এ নিয়ে যখন বেশ সরব। ঠিক তখন তেহরান ওয়াশিংটনকে দ্বিতীয় আঘাতটি করল। গত ২১ জুন অ্যামেরিকার অহংকার ও আভিজাত্যের প্রতীক গ্লোবাল হক নামক আরকিউ-৪ ড্রোনকে ভুপাতিত করে উদীয়মান পরাশক্তির দেশ ইরান । এই ড্রোনটি আবিষ্কারের নিমিত্তে গবেষণা বাবত অ্যামেরিকাকে ব্যয় করতে হয়েছিল দু’শত মিলিয়নেরও বেশী ডলার। বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে গঠিত ড্রোনটির বাজারমূল্য প্রয় ১৩১ মিলিয়ন ডলার। এমন ঘটনায় কেপে উঠে পুরো মার্কিন প্রশাসন। তাই, তাল-বেতাল হয়ে ট্রাম্প ইরানের উপর তৃতীয় পর্যায়ের অবরোধ আরোপ করে। জবাবে ইরানও পারস্য উপসাগরে ১৩/’১৯ জুন আরো দুটি টেংকার জালিয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়। ঘটনা গড়াল আরো সামনের দিকে।

ওয়াশিংটন, লন্ডন, তেলাবিব মিলে জোট বেধে একদিকে যখন পারস্য উপসাগরে সমর সাজে সজ্জিত হচ্ছে আর ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ঠিক অন্যদিকে তখন ঘটনাবহুল এসবের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে গেল এক দূর্বিষহ সন্ত্রাসি হামলা। ২০জন নিহত ও অনেক লোক আহত হয়। তার ঠিক এক দিন না যেতেই হরমুজে ইরান আটকিয়ে দিল আরেকটি তেলের টেংকার।

সর্বশেষ গত ৩-জানুয়ারী ২০২০ এ ওয়াশিংটন তাদের গ্লোবাল হক আরকিউ-৪ মানুষবিহীন ড্রোন ধ্বংশের প্রতিবাদস্বরূপ তাদের অন্য ড্রোন “এম কিউ-নাইন র‌িপ” এর সাহায্যে ইরানের সর্বৌচ্ছ ফোর্স কুদস্ কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেমানিকে হত্যা করে। এদিকে বসে নেই ইরানও..একদিকে যেমন খেলছে সামরিক খেলা তেমনি অন্যদিকে কুটনিতীতেও রয়েছে বেশ তৎপর । অন্যথায় বারো-কুতুবের দেশ ইরাকে মার্কিনিদের বিপক্ষে বিল পাস করানো আকাশকুুসুম কল্পনা ছাড়া আর কি-ইবা হতে পারে। সে যাইহোক, এভাবেই পশ্চাত্যের সাথে ইরানের যুদ্ধ লেগে আছে সে অনেক বছর আগ থেকেই। এইতো গেল ইরান নিয়ে পশ্চিমাদের খেলা। চলুন চোখ বুলাই এইবার অন্যদিকে।

১৯২৩ সালে ইউরোপ ও তুর্কী জনক কামাল পাশার মাঝে বসফরসে নৌযান চলাচলের যে ব্যাবসায়ী চুক্তি হয়েছে তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে চলেছে আগামি ২০২৩ সালে। এ চুক্তি যদি পূর্বেকার ধারায় নবায়ন করা না যায়, ইউরোপ মহা বিপদে পড়ে যাবে। তাই তারা ওৎ পেতে বসে আছে কিভাবে এরদোগান সরকারকে ২৩সালের আগেই কাপনে জড়ানো যায়!

এদিকে তুরষ্কের এস-৪০০ কিনা নিয়ে তৈরী হয়েছে নতুন বিতর্ক। আঙ্কারা রাশিয়া থেকে অস্ত্র কিনল কেন, তাই অ্যামেরিকা বলছে তারা তুরষ্ককে এফ-৩৫ বিমান দিবে না।

লক্ষণীয় হলো, এফ-৩৫ এমন একটি প্রজেক্ট যার পরিচালনার দায়িত্ব ৯টি দেশের উপর ন্যস্ত। তার মাঝে তুরষ্কের নামটি সর্বাগ্রে। কি হাস্যকর! তাই না? তৈরীকারক হয়েও বিমান পাবে না তুরষ্ক। এরদোগানের হুঙ্কারে সাম্প্রতি ট্রাম্পের সুর কিছুটা হলেও নমনীয় হয়েছে।

ওদিকে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসিদের গোপন আশ্রয় কেন্দ্র বলে যে শ্লোগান ওয়াশিংটন তুলে আসছিল ইমরান খানের ওয়াশিংটনে এক ক্যারেসমেটিক সফরেই সব বদলাতে শুরু করেছে। আফগানে প্রায় দেড় যুগ ধরে চলা যুদ্ধে তালেবানদের সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব।

এমনিভাবে কাতার, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ অসংখ্য রাষ্ট্রে আজ পশ্চিমাদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধের দামামা বাজছে প্রায় প্রতিনিয়তই। অসংখ্য মুসলিমকে হত্যা করা হচ্ছে। যার সংখ্যা আমাদের বিস্মিতকরে। ইরাকে ১৫০,০০০ থেকে ১০ লক্ষ (উইকিপেডিয়া), সিরিয়া ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৯০০ জন (বিবিসি), ইয়েমেনে নিহতের সংখ্যা ৫৭ হাজার (যুগান্তর)। এছাড়া ফিলিস্তিন, আফগান, কাশমীর, আরাকানসহ অসংখ্য জায়গায় হামলা হয়েছে। মরছে হাজার-লক্ষ মানুষ! দুঃখজনক হলো আমাদের উপলব্ধির জায়গাটা আজ বড়ই দুর্বল!

আরও পড়ুনঃ ইয়েমেন যুদ্ধে চরম মানবিক বিপর্যয়

হিসেব করলে হয়তো দেখা মিলবে আগের দুই বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় চলমান যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা বহু আগেই ছাড়িয়ে গিয়েছে। এতো কিছুর পরেও যদি রেডিওতে কান লাগিয়ে বলি “কই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের খবরতো এখনো বলছে না”। তবে বলতে হবে আমরা বোকার সর্গেই বাস করছি। এ স্বর্গের শেষ যে কোথায় তা মাবুদই ভালো বলতে পারবে। আমরাও হয়তো সেটা জানব কোন একদিন কিন্তু ততক্ষণে হয়তো মুসলিম জাতিসত্তার বিনাশ ঘটে যাবে।

তবে অতি সাম্প্রতি (মালেশিয়া- তুরষ্ক), ইরান, (পাকিস্তান- সৌদিআরব) মিলে যে জোটবদ্ধ হয়েছে তার মাঝে আমি রৌদ্রোজ্জ্বল এক সেনালি দিগন্তের পূর্বাভাষ পাচ্ছি। আমি চাই জোটবদ্ধতার এ ধারা অব্যাহত থাকুক এবং আরো মজবুতি অর্জন করুক। যদি তাই হয়, আগামির লড়াই হবে আমাদের এবং সে লড়াইয়ে আমরাই বিজয়ী হব।

মাহমুদুল হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন