বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
দুই মিনিট বাংলা বলা
জানুয়ারি ১৩, ২০২০,  ৯:২২ অপরাহ্ণ
দুই মিনিট বাংলা বলা

হঠাৎ সিদ্ধান্ত হলো দুই মিনিট বাংলা বলার প্রতিযোগিতা হবে। দুই মিনিট বাংলা বলা চলতি বাংলাদেশে কতটা কষ্টসাধ্য ভেবে দেখেছেন কি? সদ্য যাত্রা করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের সাহিত্য সংসদের কার্যনির্বাহী মিটিং এর শেষে পত্রপাঠ বিদায় নিব নিব এমন একটা সময় জনি ভাই অকস্মাৎ বলে বসলেন যে “চলো, দুই মিনিট শুধু বাংলায় কথা বলার প্রতিযোগিতা করি? ” বাংলা বলা মানে সাথে অন্য কোনো ভাষার শব্দের যত্রতত্র অনুপ্রবেশ চলবে না, নো কথ্য বাংলিশ। সবার গলার জল শুকিয়ে গেলো এই কনকনে শীতের রাতেও। যথাবিধি প্রতিযোগিতা চলতে চলতেই বলা হয়ে গেলো কতশত ইংরেজি, হিন্দি ভাষার শব্দ। কেউ কেউ কৌশলে খাঁটি বাংলার পাঠ চুকাতে পারলো। প্রতিযোগিতা শেষে দেখা গেলো অনেকেই সঠিক বাংলায় ভাষায় কথা বলতে সফল। আসলে একটু খেয়াল করে কথা বললেই কিন্ত প্রাঞ্জল বাংলায় ভাষায় মুখে খই ফু্টে। মিশ্র ভাষা যে আমাদেরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত নয় সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে আমাদের ঐ বাংলাকে সমীহ করে সোৎসাহে বাংলায় কথা বলার প্রতিযোগিতায়।

আধুনিকায়ন এবং বিশ্বগ্রামের এইকালে বিদেশী ভাষার শব্দকে মুড়ি-মুড়কি মনে করে নিজেদের জোলায় পুরতে একটুও কার্পণ্য করছি না আমরা। একটু স্মার্ট সাজতে গিয়ে নিজের ভাষায় কথা বলার মাঝে দু’একটা ইংরেজি শব্দের চাটনি কিন্তু মন্দ নয়। ঠিক এমতি চিন্তাভাবনায় নিমগ্ন থাকার প্রবণতা দিনকিদিন ক্রমবর্ধমান। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় কথা বলাটা নিয়ে আজকের অভিভাবকদেরও ব্যাপক এলার্জি লক্ষণীয়। নিতান্তই বাচ্চাকাল থেকে শহরে বেড়ে উঠা বাচ্চাকাচ্চাদের ভর্তি করিয়ে দেন ইংরেজি শিক্ষার একাডেমিতে। কারণ তারা বিশ্বাসী যে মাতৃভাষায় টাকা আনে না, ইংরেজি ভাষায় ভালো চাকর হওয়া যায়। এভাবেই ফাঁকা থেকে যায় মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা আর ভাষাগত দখল। আজকাল ফেইসবুকের যুগ। সক্রিয় ফেইসবুক ব্যবহারে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এটা ধরে নেওয়া হয়ে যে যার কোনো ফেইসবুক একাউন্ট নাই সে হলো বেকডেটেড। এই ফেইসবুকের কল্যাণে তথ্যের অবাধ ছড়াছড়ি যেমন বেগবান তদ্রুপ শিক্ষার্থীরা তাদের পরীক্ষার খাতায় আজকাল এই ফেইসবুক ব্যবহারের অকল্যাণকর স্বাক্ষরও রেখে যাচ্ছে। পরীক্ষার খাতায় লিখে আসছে ইংরেজি বর্ণে বাংলা,বাংলিশ। যেমনঃ আমার লিখছে ‘amar’, চলে যাবোকে লিখছে ‘chole jabo’। ঠিক পরীক্ষার খাতায়ও তাই করছে। এসকল বাংলা ভাষার গতিপথে সত্যিই অশনি সংকেত।

আমাদের বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যপুস্তক খুললে শিশুদের জন্য ভুল বানান আর ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি দেখতে পাই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অধিকাংশ শিক্ষকেরই নেই প্রমিত বাংলা উচ্চারণদক্ষতা। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিদ্যাপীঠ থেকে ভুল উচ্চারণ ও ভুল বানানে মাতৃভাষা শিখছে। উপরন্ত মহাবিপদ হয়ে উঠেছে হিন্দি ভাষার সিরিয়াল এবং হিন্দিতে ডাবিং করা কার্টুন ও অন্য অনুষ্ঠানগুলো। আমাদের দেশে বাংলা ভাষা নিয়ে যুক্তি-তর্কে সভা-সমিতি, রেডিও-টিভির প্যানেল ডিসকাশন যতই সরগরম হয়ে উঠুক না কেন, পত্র-পত্রিকার পাতায় অবধি, ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধসম’ এই প্রবচনের জ্ঞান গম্ভীর প্রবন্ধেই তা সীমাবদ্ধ থেকে যায়। সেই দুগ্ধের অভাব ঘটিয়ে কীভাবে আমরা নিজেরাই ভাষাকে অপুষ্ট-রিকেটি করে তুলছি – সেই ভাবনা আমাদের চেতনায় ঘা দেয় না কখনও।ইউনেস্কোর কাছে ২০১০ সালে বাংলা ‘পৃথিবীর সব চেয়ে মিষ্টি ভাষা’-র স্বীকৃতি পেলেও এদেশের মানুষের কাছে ঠিক ততটুকুই তেঁতো হয়ে উঠছে একমাত্র ভাষার মন কোঠরের কথা না বোঝার কারণে।

অন্যদিকে প্রমথ চৌধুরীর ভাষ্যমতে, “বাংলা ভাষা আহত হয়েছে সিলেটে আর নিহত হয়েছে চট্টগ্রামে। “কথাটা কতটা যৌক্তিক? আজকাল যত্রতত্র, হরহামেশাই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাটার পক্ষে বিপুল যুক্তি প্রদান করতেও দেখা যায়। কেউ কেউ বলেন আমাদের আহমেদ সফা, জয়নুল আবেদীনেরা এত প্রোথিতোজশা ব্যক্তি হয়েও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে গেছে কিন্তু তারা তো এটা ভাবেনা যে উনারা প্রমিত বাংলা ভাষার উপর কতটুকু দখল রাখতেন। ধরুণ একটা সভায় বাংলাদেশের প্রায় সকল অঞ্চলের মানুষের সমাগম। সে সভায় কোনো নির্দিষ্ট একটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা কি ঠিক হবে? তারচেয়ে বড় কথা হলো বৈদেশিক যোগাযোগ রক্ষা, চাকরীর সাক্ষাৎকারের জন্য হলেও প্রমিত বাংলা ভাষাটা চর্চা করা উচিত। আঞ্চলিক ভাষা চর্চা হোক নির্দিষ্ট এলাকায় কারণ এগুলোও বাংলা ভাষার অলংকারের মতই। প্রথম চৌধুরীর আরেকটি বিখ্যাত উক্তি আছে যে “ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে।” যেখানে কথায় কথায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করা হয় সেখানে লিখতে গেলে বাংলা শব্দগুলো মাথায় আসবে কি? ভবানীর বাংলাটা ঠিক আসেনা কবিতার গূঢ়ার্থ আজ সত্যিই মিলে যায়। আমাদেরকে এই ভাষাবিড়ম্বনা থেকে দ্রুত বেড়িয়ে আসা চাই। ঋকবেদে বলা হয়েছে, “মাতৃভূমি, নিজের সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার প্রতি প্রত্যেকের শ্রদ্ধা রাখা উচিত। কারণ সেগুলো আনন্দ দেয়।”

আরও পড়ুনঃ ইভিএমে ভোট গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক

অথর্ববেদে বলা আছে, “মাতৃভাষা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিও না। আমরা যেনো সবসময় মাতৃভাষার সেবা করতে পারি। যারা সৃষ্টিকর্তার গুণগান করতে চান তারা মাতৃভাষায় প্রার্থনা করুন। মাতৃভাষায়ই শুদ্ধতা ও সঠিকতার চর্চা করা যায়। মাতৃভাষার প্রতিটি শব্দ আমাদের রক্তের বাঁধনে বাধা। মাতৃভাষার প্রতিটি শব্দ দিয়ে মনের মতো অর্থের প্রকাশ ঘটে। প্রতিটি ‘মহান কলা’ই মাতৃভাষায় শিল্পীত হয়। মাতৃভাষায় আমরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি প্রদর্শন ও তার গুণকীর্তন করতে পারি।” তাই দেশের সর্বস্থানে মাতৃভাষার উপর নানান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হোক। এতে করে বাংলাভাষা সমৃদ্ধি লাভ করবে অচিরেই। অবশেষে প্রাণভরে গাইতে চাই, “মোদের গরব মোদের আশা,আ-মরি বাংলা ভাষা।”

নাবিল হাসান
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন