বুধবার, ২৯শে জানুয়ারি ২০২০ ইং, ১৬ই মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
ধর্ষণ হলো বিচারহীন সংস্কৃতির জারজ সন্তান
জানুয়ারি ৭, ২০২০
ধর্ষণ হলো বিচারহীন সংস্কৃতির জারজ সন্তান

ধর্ষণের হার হু হু করে বৃদ্ধির কারণ জানেন কি? প্রশ্নটার উত্তর কখনোই একটা নয়; বহুমাত্রিক! কেউ মনে করেন ধর্ষণের সাথে পরোক্ষভাবে নারীদের পোশাক জড়িত, কেউ মাদক-পর্নোগ্রাফি বা আকাশ সংস্কৃতিকে দায়ী করেন ধর্ষণের কারণ হিসাবে। ধর্ষণের পেছনের অদৃশ্যমান আরেকটি কারণ কিছুটা হলেও উন্মোচন করেছে ‘নারীপক্ষ’ নামক একটি সংস্থা তাদের গবেষণার মাধ্যমে। নারীপক্ষ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র ৪ জনের সাজা হয়েছে! যা হাস্যকর ছাড়া কিছুই না।

ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা হচ্ছে মাত্র চার জনের? মহিলা আইনজীবী সমিতির আরেক জরিপে দেখা যায় ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায় দাপটে। এসব মামলার ভেতরে যেগুলোর রায় হচ্ছে সেখানেও আছে দীর্ঘসূত্রিতা, এই সুদীর্ঘ সময়ে ধর্ষিতাকেও মনস্তাত্ত্বিক ধর্ষণের শিকার হতে হয় বছরের পর বছর জুড়ে। এমিলি ডুর্খেইমের মতে ‘অপরাধ হলো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’। কিন্তু আমার কথা হলো অপরাধ না হয় স্বাভাবিক কিন্তু বিচার না হওয়া তো আর স্বাভাবিক নয়। সুতরাং বিচারহীনতাই ঐ স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে আশকারা দিয়ে অস্বাভাবিক করে দেয়। তাই বিচারহীনতার প্রেক্ষাপটে এদেশে অপরাধ কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়।

এদিকে জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ফেরদৌসী সুলতানা সরকারের নারীবিষয়ক বিভিন্ন নীতি-পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ বা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পূর্ণাঙ্গ একটি তথ্যভান্ডার থাকা প্রয়োজন। এটা সরকারের পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য জরুরি। ফেরদৌসী বলেন, এটা ঠিক যে বাংলাদেশে যথাযথ তথ্য নেই। কিন্তু যেটুকু আছে সেগুলোর আলোকেও নীতি বা কাজ হচ্ছে না। সম্প্রতি ঘটে গেছে একটি নির্মম ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদেরই একজন মেধাবী বোনের উপর হয়েছে অমানবিক ধর্ষণ। ধর্ষক অজ্ঞাতনামা কোনো একজন।

হয়তো দেখতে হবে এই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি আর কোনো দিন আমাদের সামনেই আসবে না, হয়তো সামনে আসলেও ছাড়া পেয়ে যাবে। এর শেষ কোথায়? ধর্ষণের ঘটনাটি সামনে আসলে ক্যাম্পাস সহ ক্যাম্পাসের বাইরেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিগ্বিদিক আন্দোলন ছড়িয়ে পরে আর সকলের মুখে একটাই কথা ‘শাস্তি চাই’। এটা যৌক্তিক। একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যায় যে ধর্ষণের কারণ হিসেবে সিংহভাগ মানুষই পিছনের কারনগুলো খোঁজে এবং বন্ধ করতে বলে যেমন পর্ণগ্রাফির সহজলভ্যতা, নারীদের পোশাকাদির সমস্যা এবং আকাশ সংস্কৃতিকে কিন্তু বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন বলে আমার ধারণা। দেশের বিচারব্যবস্থাই নারীদেরকে ধর্ষণের মুখে ফেলে দিচ্ছে। পরোক্ষভাবে আমাদের ‘বিচারব্যবস্থার বেহাল দশাই’ এদেশের নারী ও শিশুদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির নেই বলেই এদেশে দিনের পর দিন ধর্ষণের মতন সামাজিক ব্যাধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শাস্তির ভয় থাকলে ধর্ষক এবং ধর্ষণের মাত্রা যে কমবে এর উপর শতভাগ আস্থা আছে এদেশের সকলের। বাংলাদেশের সিংহভাগ নারীই মনে করেন ধর্ষণের শাস্তি হোক অভিনব উপায়ে, ধর্ষকের যৌনাঙ্গ কেঁটে ফেলে। যা দেখানো হোক মিডিয়ার সামনে। আগে আমরা জানতাম যে ধর্ষক একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কিন্তু আজকাল ধর্ষকের কোনো বয়স হয় না। এখন দশ বছরের ছেলেটিও তারচেয়ে ছোট বোনটিকে ধর্ষণ করে যাচ্ছে, এরকম নজির কম নেই। এর কারণ কী? ধর্ষণের কোনো বয়স নেই। এত্ত ছোট্ট বয়সে শুধুমাত্র ‘পর্নগ্রাফির সহজলভ্যতার’ ফলেই বাচ্চাদের মতিভ্রম হয়। ছোটো ছোটো বাচ্চাদের হাতেও থাকে বড় বড় স্মার্টফোন আর সহজেই ইন্টারনেট এক্সেস পাওয়ার কারণে পর্ণ সাইটগুলোতে চলে যায়।

আবার এখানেও আরেকটা কারণ আছে যে আজকাল মোবাইল ফোনেও পুনঃপুন ভেসে উঠে খারাপ খারাপ এপস ও লিংক। তাই বাচ্চারা অজান্তেই কিংবা কৌতুহলের বসে হলেও ক্লিক করে বসে। এক্ষেত্রে অভিভাবকের অসতর্কতাই তৈরি করতে পারে আরেকজন শিশু ধর্ষক। বিচার চাইতে না যাওয়ার মানসিকতাও এদেশে ধর্ষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে। উন্নত বিশ্বের ধর্ষণের সাথে অনুন্নত বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উন্নত বিশ্বে বেশিরভাগ ধর্ষণ হয় পরিচিতদের দ্বারা আর সেখানে পুলিশ কমপ্লেইন রেট অনেক বেশী। অপরদিকে অনুন্নত বিশ্বে পুরুষত্বের খায়েশ মেটানোর জন্য রাস্তা-ঘাটে অপরিচিতদের দ্বারা ধর্ষণের সংখ্যা বেশী আর পুলিশ কমপ্লেইন রেট তুলনামূলক ভাবে কম। ঠিক এমনটিই হয়েছে আমাদের ঢাবির বোনটির উপরে। কিন্তু এই ঘটনাটি সামনে আসাতেই আমরা সকলে সোচ্চার হতে পেরেছি। ধর্ষিতারা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতনকে গোপন করছেন, ধর্ষকেরাও পার পেয়ে যায় নানা ফন্দি-ফিকিরে এই সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষকামীদের ধর্ষণ করার সাহস যোগায়। ফিকিরে এই সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষণকামীদের ধর্ষণ করার সাহস যোগায়।

আরও পড়ুনঃ ইভিএমে ভোট গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক

ময়মনসিংহে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবা গ্রেফতার (bangla.dhakatribune.com, 13-04-2019)। আলাল হুদা নামের এক ব্যক্তি তার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়েকে বিগত ৭ মাস ধরে ধর্ষণ করেছে। লোকলজ্জার ভয়ে এতদিন ঘটনাটি চাপিয়ে রাখলেও অবশেষে স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় পুলিশ আলাল হুদাকে গ্রেফতার করেছে। কোন যুক্তি দিয়ে এই নির্মমতাকে ব্যাখ্যা করবেন? পিতার সামনে মেয়ের পর্দানশীলতা, পোশাকের শালীনতা অথবা বিজাতীয় সংস্কৃতির অগ্রাসন কোন তত্ত্বই এখানে প্রযোজ্য হবেনা। উচ্চ শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এত উচ্চ শিক্ষা নিয়েও যৌন হয়রানি করে, ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু অসাধুরা ধর্মের জ্ঞান নিয়েও ধর্ষণে অংশ নেয়, নিম্নবিত্ত বাসের ড্রাইভার-হেলপারও ধর্ষকামী হয়ে উঠে কোন অজানা কারণে। মনগুলো ধর্ষকামী হয়ে ওঠার পেছনে অবাধ যৌনতা, পর্নোগ্রাফি, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, অশালীন-আবেদনময়ী ফ্যাশন বা এরকম হাজারটা কারন থাকতে পারে তবে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ এবং বিচারই পারে এই সংস্কৃতির লাগাম টেনে রাখতে। ধর্ষণের চেয়ে ধর্ষকের সংখ্যা কম কারণ একজন ধর্ষক হয়তো একাধিক নারীকে ধর্ষণ করায় সফল। তাই, ‘ধর্ষণ বন্ধ হোক’ এর আগে ‘ধর্ষককে কতল করা হোক’ স্লোগানের দামামা বেজে উঠুক।

ধর্ষণ হোক বন্ধ, দাঁড়ান সবাই পাশে।
খুলুক যে চোখ অন্ধ, ধর্ষকের মহা নাশে!

নাবিল হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email