মঙ্গলবার, ১লা ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
নারী কখন নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে সক্ষম হবে!
লেখিকা, জান্নাতুল ফেরদৌস সায়মা
নভেম্বর ২১, ২০২০,  ৭:২৯ অপরাহ্ণ
নারী কখন নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে সক্ষম হবে!

বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই নারীকে সম্মান করে। এমন ধর্ম পাওয়া যাবে না যে ধর্মে  চলাফেরা সহ নারীর জীবন ধারণের অধিকার হ্রাস করেছে। নারীর প্রতি অসংবেদনশীল আচারণে নিরুৎসাহিত করা করেছে। আর ধর্ষণকে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসলামী শরিয়তে অমার্জনীয় অপরাধ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।

ধর্ষণ শুধু একটি আইনি অপরাধই নয় বরং মানবজীবনে এর বহু পরিণতি রয়েছে যা কেবল কোন শারীরিক ক্ষতি বা আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বরঞ্চ স্থায়ী মানসিক আঘাতেরও সৃষ্টি করে থাকে। সম্প্রতি দেশব্যাপী ধর্ষণ রোধে বাংলাদেশ সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে এমন জঘন্য অপরাধ আদৌ রোধ করা সম্ভব হবে!

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ধর্ষণের স্বীকার হয় ৮১৮ জন নারী, ২০১৮ সালে হয় ৭৩২ জন এবং ২০১৯ সালে এ সংখ্যা বেড়ে গিয়ে হয় ১৭৩২ জন। আর ২০২০ সালে দীর্ঘদিন লকডাউন থাকার পরও ধর্ষণ তুলনামূলক হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে আশ্চর্যজনকভাবে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণ থেকে কোনো শ্রেণি, বয়স বা ধর্মের নারীই বাদ যাচ্ছে না। এই অপরাধীদের বেশিরভাগই হয়ে থাকে আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, প্রতিবেশী যারা ভুক্তভোগীকে চেনেন, যার কারণে অধিকাংশ সময় এসব ঘটনার পর অভিযোগ করা হয় না। এমনকি নির্যাতিতের পিতা-মাতার মতো প্রিয়জনও অভিযোগ দায়ের করতে নিরুৎসাহিত করে থাকেন। অনেক ঘটনায় সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে মামলাগুলির প্রতিবেদন অস্বীকারের মত অবস্থাও সৃষ্টি হয়। তাদের ধারণা, মামলা করলে যা হয়েছে তা ঠিক করা সম্ভব না বরং সবাই জানতে পারলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার নানা ঝামেলার স্বীকার হবে। এছাড়া আমাদের দেশের মামলার বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রিতা সম্পর্কে সবাই ভালভাবেই অবগত থাকে।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো এখনো নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আমরা এখনও এমন সমাজে বেড়ে উঠছি যেখানে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এখন আর ধর্ষণকারীর মনে কোনো ধরনের ভয় সৃষ্টি হতে দেখা যায়না আর, তারা অবাধে এ ধরনের অপরাধ করতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। দূর্বল সামাজিকীকরণের এ সমস্যার কারণে পরিবারও অনেকাংশে দায়ী। পিতামাতা তাদের মেয়েদের জীবন আচরণ নিয়ে যতটা সচেতন, ছেলেদের ক্ষেত্রে ততটা নয়। পিতামাতার উচিত মেয়েদের পাশাপাশি তাদের ছেলে সন্তানটি তার ব্যক্তিগত জীবনে কী করছে, সে তার সময় কোথায় ব্যয় করছে, কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে খেয়াল রাখা। সন্তানদের সঠিক পারিবারিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হলে এ ধরনের প্রকট সামাজিক সমস্যা হ্রাস করা সম্ভব হবে।

ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনটি প্রতিটি সুশীল সমাজে শতাব্দী পর শতাব্দী পরিবর্তিত হয়ে আসছে, তবে এই আইনের সূত্রটির একটি অন্যতম মর্মার্থ হল, পুরুষদের তুলনায় নারীর নিকৃষ্টতা এবং অসহায়ত্ব। ধর্ষণ একটি সর্বাধিক অপ্রতিবেদিত অপরাধ বলে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই ধর্ষণের কারণে একজন নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভাবস্থা, যৌন সংক্রমণজনিত রোগ, ঘুমের অনিয়ম, খাওয়ার ব্যাধি এবং অন্যান্য মানসিক ও শারীরিক অক্ষমতার মতো অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়।

আরও পড়ুনঃ জাতিগঠনে নারী সমাজের ভূমীকা

এই জঘন্য অপরাধ নির্মূলে সরকারের পাশাপাশি জনগণের দায়িত্ব হলো, তার আশপাশের পরিবেশকে নিরাপদ, সুদৃঢ় রাখা এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিবেষ্টিত করার মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করা। বাংলাদেশ ও ভারতের মত অনেক দেশে এখনো ধর্ষিতা নারীকেই দিনের পর দিন নিজের ধর্ষণের শাস্তি ভোগ করতে হয়। তাই ধর্ষণ সংঘটিত হওয়ার পর ভুক্তভোগীকে সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে অপবাদ দেয়া বন্ধ করার পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। এবং অপরাধীর পাশাপাশি ভুক্তভোগীও যেন সমাজের প্রভাবে কখনো শাস্তির শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। তাই ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধে দেশের আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিতে সকলের সোচ্চার ভূমিকাই মুক্তি দিতে পারে।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email
guest
2 Comments
Oldest
Newest
Inline Feedbacks
View all comments
Jannatul Ferdous Sayma

ধন্যবাদ।

Last edited 9 days ago by Jannatul Ferdous Sayma
Nurul Afser

🌹 জান্নাতুল ফেরদৌস সায়মা,আপনি খুব সুন্দর লিখেছেন।ধন্যবাদ।

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন