বৃহস্পতিবার, ৯ই এপ্রিল ২০২০ ইং, ২৬শে চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
পথশিশুদের পুনর্বাসন করুন
জানুয়ারি ৩০, ২০২০
পথশিশুদের পুনর্বাসন করুন

একবিংশ শতাব্দীর তুমুল প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে আমরা যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি তখনো আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ অন্ধকার তিমিরেই রয়ে যাচ্ছে। যাদের সুবিধা বঞ্চিত আর্তনাদ আমাদের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। এরা হচ্ছে আমাদের সমাজের পথশিশু। এদের জীবন-জীবীকা, বেড়ে ওঠা সবকিছু পথে পথে। এরা সমাজের নূন্যতম মৌলিক অধিকারটুকু থেকেও সদা বঞ্চিত, অবহেলিত, উপেক্ষিত।

জাতিসংঘের সংজ্ঞানুসারে তাদেরকেই শিশু বলা যাবে যাদের বয়স আঠারো বছরের নিচে। যদিও বাংলাদেশের সরকার জাতীয় শিশু নীতিতে শিশুদের বয়সকে শূন্য থেকে চৌদ্দ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশেরও বেশি শিশু-কিশোর। এই বিপুল সংখ্যক শিশু-কিশোররাই আগামীদিনের ভবিষ্যৎ, জাতির কান্ডারী। তারাই হবে এই সোনার বাংলার ভাবী পরিচালক, পথপ্রদর্শক। কথায় বলে, আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

আজকের শিশুটিই একসময় বড় হয়ে অনেক বড়ো বিজ্ঞানী, মহান শিক্ষক, চিকিৎসক, জনপ্রিয় খেলোয়ার বা চৌকস রাজনৈতিবীদ হয়ে উঠবে। আজকে যে শিশুটি হেসে খেলে বড়ো হচ্ছে কাল সেই হবে এদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতির অভিভাবক। তাইতো কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন, “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে”। সুতরাং এই দেশ ও জাতিরর মঙ্গলের কথা মাথায় রেখেই আমাদেরকে শিশুদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হবে প্রত্যেকটি শিশুকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। তাদের প্রয়োজনীয় শারিরীক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত কারার মাধ্যমে তাদেরকে নীতিবান, সৎ, কর্মদক্ষ সচেতন নাগরিক তথা রাষ্টের মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। কেননা একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও শক্তি হলো তার মানবসম্পদ।

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ ইনিস্টিউট অফ ডেভলপমেন্টের এক সম্মিলিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় পথশিশু সংখ্যা প্রায় আট লাখের উপরে। বাংলাদেশে পথশিশুদের ইতিহাস মোটেই নতুন নয়। তবে পথশিশুদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব পথশিশুরা মূলত অতিনিম্নবৃত্ত হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসে। কারো বাবা-মা নেই, কারো বাবা অন্য কোনো মহিলাকে বিয়ে করে চলে গেছে, কারো ঘরে অসুস্থ মা। এসব নির্মম বাস্তবতার দরুন তাদের ঠাঁই হয়েছে ফুটপাতে। পথেই এদের জীবন-জীবীকা, বেড়ে ওঠা, লড়াই করা, বেঁচে থাকা, সবকিছু। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাবার কথা, আকাশ, বৃষ্টি, নদী এসব নিয়ে ভাববার কথা, মাঠে ঘাটে দৌড়ে রেড়ানোর কথা সে বয়সে তাদেরকে নামতে হয় জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে।সামাজিক সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত-উপেক্ষিত এসব শিশুদের পথে পথে ঘুরতে হয় কাজের সন্ধানে।

পেটের দায়ে দিনমজুরি, বাসের হেলপারি, কারখানা শ্রমিকের কাজ, রিক্সা চালানো, চা সিগারেট বিক্রি, টোকাই এর কাজ, ইট ভাঙ্গা কত কাজই না এরা করে। এদের কারো ঘরে আবার ছোট ছোট ভাই বোন, অসুস্থ মাও রয়েছে। এরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে আপনা থেকেই নিয়ম তৈরী করে নেয়। যেহেতু এদের দেখ বাল করার কেউ নেই তাই তারা স্বভাবতই সঠিক পথের আলো থেকে অনেক দূরে অন্ধকারেই রয়ে যায়। প্রয়োজনীয় সচেতনতা, বিচারবুদ্ধি ও দিক নির্দেশনার অভাবে প্রায়শই নিজেদেরকে ভুল পরিচালিত করে। সমাজের অন্ধকারদিকের সাথে গড়ে ওঠে ভয়ংকর সখ্যতা।

জড়িয়ে যায় মাদকের নীল জালে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে এসব পথ শিশুদের ৮৫ শতাংশই মাদকাসক্ত। এরা নিয়মিত মাদক গ্রহণ করছে। মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। একপর্যায়ে এসব অবহেলিতরাই হয়ে উঠছে বেপরোয়া। মাদকের পয়সা জোগাতে তৈরি করছে কিশোর গ্যাং। চুরি, ডাকাতি, হাইজেকিং, খুন ইত্যাদি অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে খুব সহজেই। অতঃপর এরাই একেকজন হয়ে উঠছে ভয়ংকর অপরাধী। এদের এসব কর্মকান্ড একদিকে যেমন এদের জীবন বিপন্ন করছে অপরদিকে রাজধানীবাসী জনমানুষের নিরাপত্তাকে করছে বিগ্নিত।

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব সতত উপেক্ষিত পথ শিশুদের যথাযথ পূনর্বাসনের লক্ষে কার্যকর ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব শিশুদেরও অধিকার রয়েছে আটদশটা সাধারণ শিশুর মতো বেড়ে ওঠার। উপযুক্ত পুনর্বাসন, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার পেলে এরা হয়ে উঠবে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, দেশ বরেণ্য সাহিত্যক, সামাজসেবক কতো কী! এতে করে এসব পথশিশুদের জীবনপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজ এবং রাষ্ট্রও লাভবান হবে। আমাদের একটু মানবতাই বদলে দিতে পারে তাদের এই অনিশ্চিত অন্ধকার জীবনের গতিপথ। পথশিশুদের পুনর্বাসনের মূল দায়িত্বটি সরকারকেই নিতে হবে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরির পাশাপাশি শিক্ষাসহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই তাদের সঠিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্ভব।

এছাড়া সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে একাজে। মনে রাখতে হবে, আমাদের ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগগুলোই বদলে দিতে পারে এইসমাজ, এই দেশ।

 

সিয়াম আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email