বৃহস্পতিবার, ২৮শে জানুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
পশ্চিমবঙ্গে মমতার দাপট থাকবে তো?
লেখক, আরমান শেখ
নভেম্বর ২৬, ২০২০,  ১২:৪১ অপরাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গে মমতার দাপট থাকবে তো?

আগামী বছরের মাঝামাঝি বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিধানসভা নির্বাচন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সাড়া জাগানো মমতার পশ্চিমবঙ্গ দখলে এখন থেকেই ভারতীয় রাজনৈতিক মাঠ বেশ সরগরম। পরপর দুইবার নির্বাচিত হওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে মমতার একটি শক্তিশালী অবস্থান, আর এই অবস্থানের ভিত্তিতেই বিভিন্ন সময়ে তাকে দেখা গেছে কেন্দ্রীয় সরকারের গলার কাঁটা হয়ে আবির্ভাব হতে। ফলে এই রাজ্য থেকে মমতাকে হঠাতে বিজেপি সরকার কয়েক বছর আগে থেকেই পরিকল্পনা মাফিক কাজ শুরু করেছে, যার কারণে আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য ভোটকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই রাজনীতির উষ্ণ হওয়া বইছে সেখানে।

পশ্চিমবঙ্গে ঘাঁটি গেঁড়ে দিল্লির দিকে হাত বাড়ানো অগ্ননিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বশেষ আন্দোলনে রাজপথে দেখা যায় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (এনআরসি) পাশের পর। এই আন্দোলনে তাঁর শক্তিশালী অবস্থান ও নৈতিক ভিত্তি অন্যান্য রাজ্যকেও আন্দোলনের পথে টেনে এনেছিল, যার কারণে আরো কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও এনআরসি’র বাস্তবায়নে অসম্মতি জানায়। এই আন্দোলন ট্রেন এবং সরকারি স্থাপনায় আগুন লাগানোর মত ভয়াবহ রূপ ধারণ করার পর স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দেয়ার মত হুমকিও মমতা বিজেপি সরকারকে দিতে বিলম্ব করেননি। এভাবেই দিন দিন ধর্মনিরপেক্ষাতা এবং ইসলামিক সন্তুষ সাথে নিয়ে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় যখন মমতা বাঁধা হয়ে দাড়াচ্ছেন, তখন বিজেপির ছলে বলে কলে কৌশলে মমতাকে আটকাতে আট-ঘাট বেঁধে বছরের শুরু থেকে নেমে পড়া ছাড়া কোন উপায় আর থাকে না।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরিকল্পনা কতটা ফলপ্রসু তা আমরা বিগত ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। যেখানে অতীতে বিজেপি দুইটির বেশি আসন কখনো পায়নি, সেখানে ১৮ টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত দল হিসেবে বাজিমাত করেছে তারা। তবে এর ইঙ্গিত পঞ্চায়েত নির্বাচনেই পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তখনকার বিজেপির এই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনধারী হওয়ার ব্যাপারটা তৃণমূল পাত্তা না দেয়াতেই লোকসভায় এই ধাক্কা খেতে হল তাদের। এর থেকে বোঝা যায় যে, ২০১৬ সালের বিধানসভায় ২৯৪ টি আসনে মাত্র তিনটি আসন পেয়ে ভরাডুবি হওয়া সেই বিজেপি আর এখন নেই।

সাধারণত মমতার অন্যতম বড় ভোটব্যাংক হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। বলা বাহুল্য যে, বিভিন্ন লোক দেখানো ধার্মিকতা প্রদর্শন এবং ইসলামিক বুলি আওড়ানোর মাধ্যমে মমতা সর্বদাই পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীটিকে হাতে রেখেছিলেন। তবে তার এই খেলা শেষ করতে বিজেপির প্রতি আশির্বাদ হয়ে হাজির হয়েছেন ইত্তেহাদে মজলিশে মুসলেমিন (আইএমআইএম) এর জনপ্রিয় নেতা আসাদ উদ্দীন ওয়াইসি। তিনি মমতাকে লোক দেখানো তৎপরতা বন্ধের পরামর্শ দিয়ে সরাসরি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের পরিস্থিতি ভারতের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। মমতা তাদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া কিছুই করেননি। মুসলমানরা আজ চাকরী, শিক্ষা ও আইটি প্রশিক্ষণ চায়। মসজিদের ইমামদের ভাতা দিয়ে তাদের খুশি করা যাবেনা।”

অপরদিকে মুসলিমদের ধর্মীয় দিবসের ছুটি বৃদ্ধি, ইসলামিক অনুষ্ঠানে হিজাব পরিধান ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুরা অনেক আগেই মমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া শুরু করেছেন, যার ফলাফল সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দেখা যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ওয়াইসির আইএমআইএম সংখ্যালঘু একটি দল হিসেবে বিহারে প্রথমবারে ৫ টি আসনে জিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন রাজনৈতিক ময়দানে। এর পরপরই তিনি ঘোষণা দেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেও একইভাবে লড়াই করবেন। ফলে মমতাকে এখন নতুন করে ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে মুসলিম ভোট ব্যাংক রক্ষা এবং তাদের সাথে সাধারণ জনগণকে একত্রিত করার দৌড়ে নামতে হবে, অন্যথায় তার গদি বাঁচানো যাবেনা বলেই ধারণা করা যায়। আর এর প্রেক্ষিতেই হয়তো মমতা সম্প্রতি দুই টাকা কেজি রেশনের চাল ফ্রিতে দিয়েছেন কভিড পরিস্থিতির অজুহাতে। এখন বেকারদের জন্য “কর্মই ধর্ম” প্রকল্পের আওতায় দুই লক্ষ মোটরসাইকেল বরাদ্দ করেছেন এবং জানুয়ারীর মধ্যে শিক্ষার্থীদের দশ হাজার সাইকেল প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আসাদ উদ্দীন ওয়াইসির আইএমআইএম বিজেপিরই একটি চাল, বিজেপির প্রশ্রয় বা ইন্ধন ছাড়া দলটির এমন অভ্যুদয় এবং সফলতা সম্ভব নয়। মমতা ব্যানার্জি ওয়াইসিকে উগ্রপন্থী বিজেপি সমর্থনপুষ্ট বলে আখ্যায়িত করলেও তার জনপ্রিয়তা এবং সমর্থন বিহারে ঠিকই দেখা গেছে। এছাড়াও বাবরি মসজিদ, করোনার অজুহাতে মুসলিমদের নিপিড়নসহ বিভিন্ন ইসলামিক ইস্যুতে ওয়াইসির সরব ভূমিকা জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করেছে আগে থেকেই।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের অপর নেতা মুকুল রায় কংগ্রেস ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেয়ার পর তার প্রথম ঘোষণা ছিল তিনি তৃণমূলের মাঝে ব্যাপক ফাটল সৃষ্টি করবেন, যা আদতে এখনো অনেকটাই অবাস্তব থেকে গেছে। মুসলিম ভোট কাটতে ওয়াইসির আইএমআইএম থাকলেও তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনের প্রভাব জনগণের মাঝে থাকায় দলটিতে ভাঙ্গন সৃষ্টি ছাড়া বিজেপির নির্বাচনে জেতার স্বপ্ন সহজে বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয়না। তবে বিজেপি তৃণমূলে ফাটল ধরাতে গিয়ে নিজেরাই না ফাটলে পড়ে যায়, সেই আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। কারণ সদ্য দলত্যাগী প্রভাবশালী নেতা মুকুল রায় এবং পশ্চিমে বিজেপির আস্থা হিসেবে খ্যাত রাজ্যের দলীয় সভাপতি দিলীপ ঘোষের মাঝে রয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বকে দূরে ঠেলে দলের স্বার্থে কে কতটা ছাড় দিয়ে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে তাই এখন দেখার পালা।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির দীর্ঘ শাসনের প্রভাব এবং শক্তির কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতে অবস্থা সুবিধাজনক না দেখলে বিজেপি নতুন চালও চালতে পারে। ইতোমধ্যেই বিজেপির সেকেন্ড ইন কমান্ড অমিত শাহ বিগত নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটকেন্দ্রে ঝামেলা সৃষ্টি, ভোটারদের স্বাধীনভাবে প্রবেশে বাঁধা প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন চেয়েছে। যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বিজেপি নিজেদের যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে। নির্বাচনের আগে পুলিশি হয়রানি, তৃণমূল ত্যাগে ইচ্ছুক নেতাদের দমনসহ বিভিন্ন দিকে মমতার ক্ষমতা খর্ব হবে এবং নির্বাচনে কেন্দ্রের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অনেকেই বিজেপির পক্ষে আসতে উৎসাহি হতে পারে। এছাড়াও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বিজেপির ঘোর বিরোধী বামপন্থী সমর্থকরাও ইদানিংকালে বিজেপিতে ভিড়ছে যা বামপন্থীদের জন্য সুখকর হবেনা কখনো।

পরিশেষে প্রশ্ন এসেই যায়, কে নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের জন্য ভাল হবে। ব্যাপারটা অনেকটা “নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভাল”র মতো। কারণ ক্ষমতাসীন বিজেপি যেভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ সৃষ্টি প্রকট এবং স্থায়ী করে ভোট ব্যাংক তৈরিতে বাংলাদেশের হিন্দুদেরও নাগরিকত্ব প্রদান করার মত প্রতিশ্রুতি দিয়ে এনআরসি বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে, তা কখনো বাংলাদেশের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনবে না। বরঞ্চ পুরো উপমহাদেশ জুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। যখন সিটিজেন এমেন্ডমেন্ট এক্ট (সিএএ) পাশের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে ঊনিশ লক্ষ মানুষকে বাংলাদেশি ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়, তখনই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আচমকা ভারতীয় প্রবেশ বেড়ে যায়, যা নিয়ে প্রায় সব টিভি এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আর যখন মমতার মতো  নাগরিক তালিকা (এনআরসি), সংশোধিত নাগরিক আইন (সিএএ) ও জনসংখ্যা তালিকা (এনপিআর) বিরোধী কোন নেতা থাকবে না, তখন সীমান্তে কী হতে পারে তা আন্দাজ করাই যায়।

তাছাড়া মমতাকে হঠানোর পর বিজেপির প্রথম কাজ যে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বাস্তবায়ন করা, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বিজেপি ছাড়া দ্বিতীয় মেয়াদে অধিষ্টিত স্বয়ং রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও এনআরসি আন্দোলনের সময় বলেছিলেন, “ভারতের সর্বত্র এই আইন বাস্তবায়ন করা না হলেও সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে করা হবে।” এর দ্বারা যে তিনি পশ্চিমবঙ্গকেই বুঝিয়েছেন তা সাধারণ মানুষও বুঝে।

আরও পড়ুনঃ এশীয়ায় চীনের নেতৃত্বে বাণিজ্য অভ্যুত্থান

পরিশেষে বলা যায়, তৃণমূলের জন্য আসন্ন নির্বাচনটি পরিণত হতে যাচ্ছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। যদি ক্ষমতা থেকে মমতা সরে যান, তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নিজের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে অনেক কিছুই করবে নির্দ্বিধায়, যা পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনসহ  বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (সমাজতত্ত্ব বিভাগ)

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন