বুধবার, ১৪ই এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১লা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
প্রকৃত দেশপ্রেম মানে কি !
ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯,  ১:০৫ অপরাহ্ণ
প্রকৃত দেশপ্রেম মানে কি !

বৃহত্তর অর্থে মানুষ ধরিত্রীর সন্তান। কিন্তু পৃথিবী সুনির্দিষ্ট অর্থে তার জন্মপরিচয়ের ঠিকানা নয়। প্রতিটি মানুষ জন্ম নেয় পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে, যা তার কাছে তার স্বদেশ। অর্থাৎ একটা শিশু যে দেশে জন্ম গ্রহণ করে সেটাই তার স্বদেশ। এই স্বদেশের সঙ্গেই গড়ে ওঠে তার গভীর সম্পর্ক। স্বদেশের জন্য তার মনে জন্ম নেয় এক নিবিড় ভালবাসা। স্বদেশের আলো, বাতাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা ঐতিহ্যের সাথে গড়ে ওঠে তার শেকড়ের বন্ধন। স্বদেশের প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি গভীর এই অনুরাগ ও বন্ধনের নামই স্বদেশপ্রেম। মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষার প্রতি মানুষের যে চিরায়ত গভীর ভালবাসা তারই বিশেষ আবেগময় প্রকাশ ঘটে স্বদেশপ্রেমের মধ্যে।

উপরে বর্ণিত বাক্য গুলো কেবলই স্বদেশপ্রেমের সজ্ঞা। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমের নির্দিষ্ট কোন সজ্ঞা নেই। কেননা দেশপ্রেমকে কোন সজ্ঞায় সজ্ঞায়িত করা যায় না। আরিফ আর হোসাইন দেশপ্রেম সম্পর্কে একটি কথা বলেছিলেন, আমিসহ পঞ্চাশ জনকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় দেশপ্রেম কি, তাখলে পঞ্চাশজন একান্ন রকমের উত্তর দিবে। কেননা, আমি নিজেই দু’বার দুই রকমের উত্তর দিবো। বাকী পঞ্চাশজন পঞ্চাশ রকম ভাবে দেশপ্রেমকে সজ্ঞায়িত করবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটা দেশপ্রেম না। জীবনের ৪০টি বছর পর এসে জানতে পারলাম দেশপ্রেম মানে হচ্ছে ডেডিকেশন। আসলে প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেম মানেই হচ্ছে ডেডিকেশন। অর্থাৎ যার যার অবস্থান থেজে দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করাটাই হচ্ছে দেশপ্রেম।

১৯৭১ সালে আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। সে সময় পাকিস্তানিরা আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার একটা লিস্ট তৈরি করেছিল। তারা কিন্তু সাধারণ মানুষদের হত্যা করার জন্য লিস্ট তৈরি করেনি। কারণ সাধারণ মানুষরা দেশকে বুদ্ধিজীবীদের মতো করে তেমন কোন কিছু দিচ্ছিল না কিংবা দেশের কাজে তাঁদের মতো করে ডেডিকেটেড ছিলনা। কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা দেশের স্বাধীনতা অর্জন, দিক নির্দেশনা ও বহির্বিশ্বে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করেছিল। কারণ তাঁরা তাঁদের কাজে ডেডিকেটেড ছিল। আর এই জন্যই পাকিস্তানিরা সেক্টর ধরে ধরে বুদ্ধুজীবীদের হত্যা করেছিল।

দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করতে চাও-জহির রায়হানকে মারো। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চাও- মুনীর চৌধুরীকে মারো। দেশের সংস্কৃতিকে ধ্বংকে করতে চাও-আলতাফ মাহমুদকে মারো। অর্থাৎ দেশের জন্য যে যেই কাজে ডেডিকেটেড তাঁকে মেরে ফেলো। পাকিস্তানিরা কিন্তু তাই করেছে। ১৯৭১ সালে তারা আমাদের দেশের যে পরিমাণ বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও কিন্তু আজ আমাদের দেশে তার অর্ধেক পরিমাণ বুদ্ধিজীবী নেই। কারণ আমরা কেউই এখন আর তাদের মতো করে যার যার কাজে ডেডিকেটেড নেই। আজকে আমরা খেলা নিয়ে কথা বলি, কাল পলিটিক্স নিয়ে, পরশু দিন সংস্কৃতি কিংবা ধর্ম নিয়ে। আমরা সবাই এখন একেকজন একেক কাজে উস্তাদ।

২০১৬ সালের শেষ দিকে ভারতের বিখ্যাত তবলা বাদককে পিছনে ফেলে বাংলাদেশী যুবক প্রথম হয়েছেন। আচ্ছা, ওনি যদি তবলা বাজানোর পাশাপাশি গিটার বাজাতেন কিংবা গান গাওয়া শুরু করতেন তাখলে কিন্তু ওনিও হয়তো বিখ্যাত তবলা বাদক হয়ে উঠতে পারতেন না।

আবার আব্দুল্লাহ আবু সায়িদ স্যার যদি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র চালানোর পাশাপাশি মুভি বানানো শুরু করে দিতেন, তাখলে কিন্তু তিনিও হয়তো আজ বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারতেন না।

অন্যদিকে বিশ্বসেরা ক্রিকেট অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান যদি ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি অন্যান্য খেলাধুলায় মনোনিবেশ করতেন তাখলে তিনিও কিন্তু আজকের এই বিশ্ববিখ্যাত ক্রিকেটার হতে পারতেন না। তাঁরা পেরেছেন, কারণ তারা তাদের কাজে ডেডিকেটেড ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আর এটাই দেশপ্রেম।

একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন, আপনি কোনটাতে সেরা। কোনটাতে সাপোর্ট পাচ্ছেন। তারপর চোখ খুলে সেই কাজটাতে নেমে পড়ুন। আপনি ভালো লিখতে পারেন, তাখলে লেখাটাই ভালো ভাবে চালিয়ে যান না, দেশের কাজে। আপনি ভালো ছবি আঁকতে পারেন, তাখলে সেটাতেই ডেডিকেটেড থাকেন না। সেটা দিয়েই আবহমান গ্রাম বাংলার প্রকৃতি ও দেশের কথা তুলে আনেন না। আপনি ভালো ছবি তুলতে পারেন, ভালো ভাবে মোটিভেট দিতে পারেন, ভালো গান লিখতে পারেন, ভালো ভাবে গান গাইতে পারেন, ভালো নাচতে পারেন ইত্যাদি যেটাই ভালো পারেন, সেটাতেই ভালো ভাবে লেগে থাকুন, ডেডিকেটেড থাকুন। আপনার এই লেগে থাকাটা, এটাই কিন্তু দেশপ্রেম।

আর একটু ক্লিয়ার করে বলি, আচ্ছা একটা ক্রিকেটারের দেশপ্রেম কি? দেশের হয়ে খেলা, ছক্কা মারা, ঝাপিয়ে পড়ে ক্যাচ ধরা। হ্যাঁ এটাই দেশপ্রেম। কারণ তারা এটাতেই ডেডিকেটেড। এটা দিয়ে তারা দেশের সুনাম বয়ে আনবে। এটা দিয়েই দেশকে রিপ্রেজেন্ট করবে।
আচ্ছা একটা ক্রিকেটারের কি ইচ্ছে করেনা পেট ভরে কাচ্ছি বিরিয়ানি খেতে। মন চায় তার পরেও খায়না। কারণ, বেশি খেলে ফিট থাকা যাবেনা। তাদের কি মন চায় না, বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে, আড্ডার মধ্যে যা তা খেতে, যা ইচ্ছে তা করতে। মন ঠিকই চায়। কিন্তু করে না। ওই যে তারা কিক্রেটে ডেডিকেটেড। তারা বাজে কিছুতে আশক্ত হলে, ক্রিকেটে ভালো কিছু দিতে পারবে না। তাই তারা এসবে যায়না, দেশকে ভালো কিছু দেওয়ার জন্য। আর এটাই দেশপ্রেম। সব কাজের কাজী হওয়ার নাম দেশপ্রেম না।

সবাই কে দিয়ে সব কিছু হয়না, হবেও না। আপনি শুধু যেটাতে ভালো পারেন ভালো বুঝোন সেটাতেই নিঃস্বার্থ ভাবে লেগে থাকুন।
আর এর জন্যই বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষনে ডাক দিয়ে ছিলেন ঠিক এইভাবে “যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাপিয়ে পড়ুন শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্য।

আপনি টগবগে যুবক, সুস্থ সবল, আপনি তাড়াতাড়ি বন্দুক হাতে নেমে পড়ুন স্বাধীনতা যুদ্ধে। আপনার কণ্ঠ সুন্দর, ভালো ভাবে ঘুচিয়ে কথা বলতে শিখুন। আপনি যান -স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে দেশের অবস্থান সম্পর্কে খবরাখবর ও গতিবিধি সম্পর্কে সচেতনামূলক বার্তা প্রেরণ করুণ সবার মাঝে। আপনি মহিলা। ভাবছেন কিভাবে যুদ্ধে যাবেন। দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনি তাড়াতাড়ি একদল মুক্তিবাহিনীকে আজ রাতে রান্না করে খাওয়ান। আপনার হাতের রান্না খেয়ে শরীরে শক্তি যুগিয়ে তারা যুদ্ধে যাপিয়ে পড়বে। এটাই তো মুক্তিযুদ্ধে আপনার সবচেয়ে বড় অবদান।

আপনি বৃদ্ধ। ভাবছেন কিভাবে যুদ্ধে যাবেন। আপনি নৌকা চালাতে পারেন। তাখলে আপনারও চিন্তার কোন কারণ নেই। আজ রাতে মুক্তিবাহিনীরা পাকিস্তানি ঘাটিতে আক্রমণ চালাবে। আপনি তাদের নৌকা চালিয়ে নদী পার করিয়ে দিন। এটাই আপনার দেশের পক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অবদান

উপরের সবাই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধা। বঙ্গবন্ধু কিন্তু ভেবে চিন্তেই বলেছিলেন “যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাপিয়ে পড়ো” এই “যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাপিয়ে পড়া” এটাই হলো দেশপ্রেম। এটাই হলো হারিয়ে ফেলা সেই একাত্তরের চেতনা।

আসুন আমরা যে যেটাতে বেস্ট। সেটাতেই ডেডিকেটেড থাকি। সেটাই মনোযোগ দিয়ে করি। দেশ আমাদের কি দিচ্ছে সেটা না ভেবে দেশকে আমরা কি দিচ্ছি সেটা ভাবাটায় হচ্ছে দেশপ্রেম। দেশকে মন থেকে ভালবাসুন, একটা সময় দেখবেন দেশ আপনাকে ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে।

লেখকঃ আয়ান নুহা আলামিন
শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন