শনিবার, ১৬ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
বইকে বই
নভেম্বর ১০, ২০১৮
বইকে বই

বইয়ের পাতায় জীবন থাকে না। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, লব্ধ জ্ঞান, থরে থরে কেঁখে কেঁখে সাজানো থাকে বইয়ের পাতায়। অথচ ইদানিং আমরা বইকেই জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস বলে ধরে নিয়েছি। শিক্ষা গ্রহণ কিংবা লাভের একমাত্র উপায় যে শুধু বই নয়, তা আমরা ভুলতে বসেছি। ভুলতে বসেছি বলেই বোধহয় একমাত্র বইকে অবলম্বন করে এগিয়ে চলা শিক্ষা পদ্ধতি ইতোমধ্যে সমাজে তার বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে দিয়েছে।

পুঁথিগত বিদ্যায় আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, পুঁথির বুলি আওড়াতে আওড়াতে আমরা বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে এসেছি। বক্তৃতার মঞ্চে সুন্দর উপস্থাপনায় বক্তব্য রাখতে শিখেছি বটে, কিন্তু ভুলে যাচ্ছি পাশে বসে থাকা মানুষটার সাথে স্বাভাবিক সৌজন্যতায় কথা বলা। মানুষে মানুষে সহজাত আলাপচারিতা যেন ম্রিয়মান প্রায়। ছোট বেলা থেকেই বইয়ের বোঝা বইতে বইতে বইয়ের উপর ভর করে ছাড়া আর এগোতে পারি না। বাড়ীতে অতিথি এলে মা-বাবার অনুরোধে বাচ্চারা ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে ৫/৭ খানা রাইমস্ হয়তো শুনিয়ে দিতে পারবে কিন্তু তাদের সাথে সহজভাবে মিশতে এবং কথা বলতে পারবে কয়টি শিশু।

মোবাইলের এ্যাংগ্রি বার্ড, টকিং টম খেলতে জানা শিশুরা কানামাছি, গোল্লাছুট এর স্বাদ পাবে কোথায়! কার্টুন দেখা শিশুরা তো আজ চেনে মটু, পাতলু, নাট, বল্টুদের; পাশের বাড়ীতে থাকা অরুন, বরুন, রীতুর সাথে তাদের পরিচয় কোথায়! বাস্তবতা বিবর্জিত এসব কোমলমতি শিশুরা তাই সহজ হতে পারে না চারপাশের মানুষগুলোর সাথে। স্কুলে ফার্স্ট হওয়া, অংক-ইংরেজীতে হাইয়েষ্ট পাওয়া ছাড়াও যে জীবনে আরও অনেক পাওয়া আছে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলেও যে দলের সেরা হওয়া যায়, এসব না জেনেই তারা শৈশব হারিয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন বইয়ের মতন আদর্শ বাচ্চা চাই। কিন্তু বই যিনি লিখেছিলেন তিনি কি তা মানতেন! নাকি তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ শিক্ষাটুকুই তুলে দিয়েছিলেন বইয়ের পাতায়! অন্যের জীবন থেকে পরোক্ষভাবে শিখতে হয় বলেই এধরনের শিক্ষা আমাদের হৃদয়ঙ্গম হয় না। কোনমতে পরীক্ষা পার হয় বটে, কিন্তু জীবনের নানা পরীক্ষায় পদে পদে হোঁচট খেতে হয়।

জীবনমুখী শিক্ষার বদলে জীবন এখন শুধুই শিক্ষামুখী হয়ে পড়েছে। জীবনের স্বাদ-আনন্দ-আহ্লাদ এখন উপেক্ষিত। জীবনের পথে চলতে চলতে শেখার বদলে এখন আমরা শিখতে শিখতে কোন রকমে জীবনটাকে চালিয়ে নিই। খাঁচার পাখির মত শিখানো বুলিতে পারদর্শী এই আমরা মুক্তাকাশে মন খোলার স্বাদ পাই কোথায়…….

আশরাফুন্নাহার রীটা
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নাটোর

Print Friendly, PDF & Email