বুধবার, ২৯শে জানুয়ারি ২০২০ ইং, ১৬ই মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
বই হলো আলোকিত জীবনের প্রকৃত উপকরণ
নভেম্বর ১৮, ২০১৯
বই হলো আলোকিত জীবনের প্রকৃত উপকরণ

আলোকিত জীবনের উপকরণ হচ্ছে বই। জগতে শিক্ষার আলো, নীতি-আদর্শ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সভ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি সবই জ্ঞানের প্রতীক বইয়ের মধ্যে নিহিত। পৃথিবীতে বিনোদনের কত মাধ্যমই না এলো গেল, কিছুই টিকলো না এই বই পড়ার গুরত্বের কাছে। সুন্দর মানুষ গড়ার সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বই। তাইতো জ্ঞানের পাখি, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, হে আল্লাহ তুমি আমাকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখ বই পড়ার জন্য। তিনি প্রতিদিন কমপক্ষে ১৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। কারণ তিনি জানতেন বই পড়া ছাড়া কোনভাবেই জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। বই ছিল তার একমাত্র বন্ধু। বই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

তিনি একদিন পাঠাগারের এক কোনায় বসে বই পড়ছেন পড়ছেনতো পড়ছেনই, বইয়ের মাঝে ডুবে একাকার হয়ে আছেন। পাঠাগারের এক কোনায় বসে পড়তে থাকায় পাঠাগার কর্তৃপক্ষ পাঠাগার বন্ধ করার সময় হলে তাকে লক্ষ্য না করে পাঠাগার বন্ধ করে চলে গেলেন। কিন্তু শহীদুল্লাহ বিরামহীনভাবে পড়ছেন, কোন সময় পাঠাগার বন্ধ করা হলো তা তিনি টেরই পেলেন না।

যত বড়ই বই হোক না কেন, শহীদুল্লাহ একবারে শেষ না করে কোনোভাবেই উঠতেন না। যা হোক পরদিন রীতিমত পাঠাগার খোলা হলো। খোলামাত্র পাঠাগার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে তিনি পড়লেন। কর্তৃপক্ষ তাকে দেখে তো হতবাক। শহীদুল্লাহকে তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি পুরো রাতদিন পাঠাগারে বন্দি ছিলেন? তখন শহীদুল্লাহর বই পড়ার ধ্যান ভেঙে গেল এবং মুখ খুলে বললেন অবচেতন মনে ‘না তো, আমি বই পড়ছিলাম।

পল্লী কবি জসীমউদ্দিন বলেছেন,‘বই জ্ঞানের প্রতীক,বই আনন্দের প্রতীক। ‘জ্ঞান আর আনন্দ ছাড়া মানব জীবন নিশ্চল হয়ে পড়ে। জীবনকে সুন্দর ভাবে বিকশিত করতে হলে, সুবাসিত করতে হলে জ্ঞানার্জন করতে হবে। আর জ্ঞানার্জন করতে হলে বই পড়ার কোন বিকল্প নাই। বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, মননশীলতার সম্প্রসারণ ও জ্ঞানের গভীরতা বাড়ায়।

এছাড়াও বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তি থেকে আমরা জানতে পারি আরো অনেক কিছু। যেমনঃ টুপার বলেছেন একটি ভালো বই হলো বর্তমান ও চিরকালের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বন্ধু। সুইফট বলেছেন বই হচ্ছে মস্তিষ্কের সন্তান। এছাড়াও, ভালো বই পড়া যেনো গত শতকের মহৎ লোকের সাথে আলাপ করার মতো-দেকার্তে, ভালো খাদ্য বস্তু পেট ভরে কিন্ত ভাল বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে-স্পিনোজা, বই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ আত্মীয় যার সঙ্গে কোনদিন ঝগড়া হয় না,কোনদিন মনোমালিন্য হয় না-প্রতিভা বসু,  A room without books is like a body without soul-(Marcus Tulious Sesaro)

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বর্তমানে বই প্রেমিকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। তরুণদের মাঝে বই পড়ার প্রবণতা একেবারে নেই বললেই চলে। ইন্টারনেটের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বই বিমূখতা হচ্ছে তরুণ সমাজ। সমাজচিন্তাবিদরা ইন্টারনেট, ইউটিউব, মোবাইল আর ফেইসবুকে আসক্ত প্রজন্মের সৃজনশীলতা নিয়ে সন্দিহান। তারা মনে করেন, এরা যতই থাকুক পরিপাটি, বাইরে দেখাক যতই স্মার্টনেস, আসলে তারা বই বিমুখ একটি অন্তঃসার শূন্য প্রজন্ম।

বই পড়া থেকে দূরে থাকার ফলে মানুষ হয়ে পড়ে বিকৃত ও অসুস্থ, ব্যাহত হয় তার মানবিক বিকাশ। ক্রমশ হারিয়ে ফেলে মানুষত্ব। বর্তমানে তরুণ সমাজ বই থেকে দুরে থাকার ফলে তাদের মানবিক জ্ঞান যে লোপ পেয়েছে তার চুড়ান্ত প্রমাণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। আবরার হত্যা যার জ্বলন্ত উদাহরন। অথচ পৃথিবীতে যে জাতি যত উন্নত সে জাতির পাঠাভ্যাসেরর ইতিহাস ততই বিস্তৃত।

বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম যে ভাবে বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তা যেকোন সমাজ ব্যবস্থার জন্য হুমকি স্বরুপ। বই মানুষেকে আলোর পথ দেখায়। একটি ভালো বই যে কোন সময় যে কোন মানুষকে আমূল বদল দিতে পারে। তার মানবিক গুনগুলো বিকশিত করে তাকে দায়িত্বশীল, সচেতন দেশপ্রেমিক ও বুদ্ধিদীপ্ত নাগরিকে পরিণত করতে পারে। সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ জাতি গঠণে বই পড়ার কোন বিকল্প নেই। তাই বই হউক আমাদের চলার সংঙ্গি। তাই বই পড়ুন, নিজেকে চিনুন,সমাজকে জানুন, সমাজের মানুষকে জানুন, সেই আলোকে জীবন গড়ুন। আর এ জাতীয় স্লোগান হয়ে উঠুক আমাদের প্রতিদিনের শপথ।

মোঃ ফুয়াদ হাসান
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email