শনিবার, ২৮শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে
মে ২, ২০২০,  ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ব্যবহারের সতর্ক থাকতে হবে বলে মতামত দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, এসব টাকা ব্যবহার করতে হবে উৎপাদন খাতে, বাড়াতে হবে কর্মসংস্থান। এর বাইরে এসব টাকা ভোগবিলাসে ব্যবহৃত হলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব টাকা অর্থনীতিতে ‘হিতে বিপরীত’ হবে।

অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করতে এখন পর্যন্ত লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শে ব্যাংকিং খাতে টাকার প্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এখন পর্যন্ত সরাসরি ৭৩ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছাড়ার সিন্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৭টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ছাড়া হবে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৮ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ আমানতের নগদ জমা সংরক্ষণের হারে (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) দেড় শতাংশ ছাড় দিয়ে ব্যাংকগুলোর জমা এ টাকা বাজারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো দেবে ২৫ হাজার কোটি এবং সরকার দেবে বাজেট থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় শিল্পে ও সেবা খাতে চলতি মূলধন ঋণের জোগান দিতে ১৫ হাজার কোটি টাকার এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে চলতি মূলধনের জোগান দিতে ১০ হাজার কোটি টাকার দুটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। এসব তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়া হবে। রফতানিমুখী শিল্পে পণ্য তৈরির পর জাহাজীকরণের আগে ঋণের জোগান দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে সরকার। এখান থেকে ৩ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলো ঋণ নেবে। রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়াতে ১৫০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার জোগান দেবে। ১ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে এ অর্থ দেবে।

সবুজ কারখানা স্থাপনে ২০ কোটি ইউরো বা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এখান থেকে ১ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া ফুল, ফলসহ কয়েকটি খাতে ঋণ দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল এবং এনজিওদের মাধ্যমে প্রান্তিক চাষী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ দিতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে।

এসব তহবিল থেকে গ্রাহকদের ঋণ বিতরণের সুদের হারও কমানো হয়েছে। এগুলোর প্রতিটিই হবে ঘূর্ণায়মান তহবিল। গ্রাহকদের ঋণ দেয়ার পর তারা তা সুদসহ ফেরত দিলে এগুলো আবার মূল তহবিলের সঙ্গে যোগ হবে। এভাবে তহবিলের আকার বাড়বে। ফলে ওইসব অর্থও ঋণ হিসেবে দেয়া হবে। এর মধ্যে রফতানি খাতের ঋণ ফেরত আসবে ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে। ফলে রফতানি খাতের দুটি তহবিলের আকার দ্রুত বাড়বে। এসব মিলে টাকার প্রবাহও বাড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থকে বলা হয় ‘হাই পাওয়ার্ড মানি বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাকা’। যা বাজারে গিয়ে দ্বিগুণের বেশি টাকার জন্ম দেয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে অর্থ বের হবে, তা বাজারে এসে দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ বেড়ে যাবে। যে কারণে এসব টাকার ব্যবস্থাপনা শক্ত হাতে করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে টাকা বাজারে ছাড়বে তার ওপর কঠোর তদারকি করতে হবে। যাতে টাকার কোনো অংশই অপব্যবহৃত না হয়। সরাসরি এগুলোকে উৎপাদন খাতে নিতে হবে। তখন উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন খাতে যাওয়ার কারণে কর্মসংস্থানের হার বাড়বে। তখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চাহিদাও বেড়ে যাবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকায় একদিকে উৎপাদন বেড়ে পণ্যের জোগান বাড়বে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান বাড়ার কারণে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে তাদের চাহিদা বেড়ে যাবে। এ দু’ভাবে অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষিত হবে।

তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, টাকার অপব্যবহার হলে বা উৎপাদন খাতে না গেলে বিপদ হবে। তখন মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। কর্মসংস্থান না হলে একদিকে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমবে, অন্যদিকে বাড়বে পণ্যের দাম। ফলে অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে যায়। এ জন্য এখন থেকে টাকার উত্তম ব্যবহারের জন্য তদারকি বাড়াতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে আদলেই টাকা বের হোক তা বাজারে গিয়ে মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা বের করা হচ্ছে সেহেতু এ টাকা ব্যবহারে অনিয়ম রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। যে কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারকে এ সংকট মোকাবেলায় বৈদেশিক উৎস থেকে কম সুদের ঋণ বা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকার কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে সেগুলো উৎপাদনমুখী খাতে নিতে হবে। যে কোনো সংকটের পর উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হলে মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব দ্রুত কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়। সেদিকেই এখন নজর দিতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, কম সুদে এসব টাকার জোগান দেয়া হচ্ছে। এগুলো সরাসরি উৎপাদন খাতে দিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এগুলো উৎপাদন খাতে গেলে উৎপাদনের খরচ কমে যাবে। কারণ সুদের হার অনেক কম। ফলে গ্রাহকরা যেমন লভবান হবে, তেমনি উৎপাদন খরচ কমার কারণে পণ্যের দামও কমার কথা। এতে ভোক্তারা লাভবান হবেন। উৎপাদন খরচ কম হওয়ার কারণে রফতানি বাজারেও প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে। সব মিলে প্রণোদনার সঠিক ব্যবহার হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ ছাড়াও নীতি সহায়তা বাবদ আরও বেশ কিছু প্রণোদনা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এগুলোর ইতিবাচক প্রভাবও রফতানি ও উৎপাদন খাতে পড়বে। বিভিন্ন খাতে আরও কিছু প্রণোদনা ঘোষণা করা হবে। এর মধ্যে নীতি সহায়তার পাশাপাশি নগদ অর্থ ছাড়ের বিষয়টিও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক করোনার কারণে বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক চিত্রের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এর আলোকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সূত্র: অনলাইন

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন