শনিবার, ১১ই জুলাই ২০২০ ইং, ২৭শে আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
বাজেট ২০২০-২১: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক
জুন ১৬, ২০২০
বাজেট ২০২০-২১: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০–২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন। আর নতুন অর্থবছরের জন্য ৮ দশমিক ২ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে।উক্ত বাজেটের বেশ কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে ।

আকাশচুম্বী জিডিপি প্রবৃদ্ধির বাজেট :
প্রত্যাশা ছিল, সরকার প্রবৃদ্ধিনির্ভর গতানুগতিক উন্নয়ন কৌশল থেকে বেরিয়ে আসবে।
কেননা গত এক দশকের প্রবৃদ্ধিমুখী উন্নয়ন যে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের জন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি, করোনা সংকটে তা স্পষ্ট হয়েছে। অর্থমন্ত্রী সংসদে যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, তার প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ৮ দশমিক ২ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির যে আকাশচুম্বী লক্ষ্য ধরা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসের সঙ্গে তার মিল নেই। বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সংকোচন হতে পারে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে।
তা ছাড়া রেমিট্যান্স আয় এবং রপ্তানি আয় করোনাকালীন সংকটের কারণে অনেক কমে যাবে।এসব পূর্বাভাস সত্ত্বেও প্রস্তাবিত বাজেট দেখে মনে হয়, অর্থমন্ত্রী আশা করছেন যে দেশের অর্থনীতি এই সংকটকালে আলাদিনের প্রদীপের স্পর্শে এই জুলাই মাস থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে সবাইকে চমকে দিবে। কোভিড মহামারিতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ জাতীয় অর্থনীতির যখন বেহাল অবস্থা, এই সময়ে জাতীয় বাজেটের লক্ষ্য শুধু জিডিপিকেন্দ্রিক হওয়া কতটা বিবেচকের লক্ষণ তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।

ঘাটতি বাজেট পূরণ নিয়ে প্রশ্ন :
বাজেটে ব্যয়ের মাত্রা বেশি হলে আয়ও বেশি করতে হবে। কিন্তু সেই আয় কোথা থেকে আসবে, আর এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রাক্কলন কতটা বাস্তবভিত্তিক,তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।২০২০-২১ অর্থবছরে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং
রাজস্ব ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা;যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে জিডিপির ৬ দশমিক শূন্য শতাংশে দাঁড়াবে।
আয় ও ব্যয়ের বিপরীতে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশি–বিদেশি উৎস থেকে সংগ্রহ করার কথা আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেন, তা বাস্তবায়নই কঠিন হয়ে পড়ে। এবার এ সংকটকালে কীভাবে আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে,তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা বলেছেন। এর আগে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল, তারও প্রধান উৎস ব্যাংকঋণ। ফলে বেসরকারি ব্যাংক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।অথচ প্রত্যাশা ছিল অনুৎপাদনশীল খাতের ব্যয় যথাসম্ভব কমানো হবে।

স্বাস্থ্যখাতে অপ্রতুল বরাদ্দ :
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম ব্যয় করে। এই খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে ২৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। আর করোনা সংকটের সময় জরুরি ব্যয় হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ এ অর্থ ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই।
স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ স্থিতিশীল রয়ে গেছে, যদিও পরিচালন ব্যয় গত অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। এবারও জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যদিও এবারই জরুরি ছিল অন্তত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশমতো জিডিপির ৪ শতাংশ বা তার ওপরে বরাদ্দ রাখা।
সারা বিশ্ব যখন জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতি, তখনো আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয় আটকে আছে জিডিপির ডিসকোর্সের মধ্যে।অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেনের মতে, “জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি সবাই চাই, কিন্তু উন্নয়নের লক্ষ্য জিডিপি নয়, জিডিপির লক্ষ্য মানুষকে উন্নত স্বাস্থ্য দেওয়া।” মহামারির বছরেও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে গুণগতভাবে কোনো পরিবর্তন এল না।অথচ প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে দেশের স্বাস্থ্যখাত ।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন :
সামাজিক সুরক্ষা খাতে এবার বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বটে, কিন্তু করোনার কারণে যেসব মানুষ কাজ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার ওপর থেকে নিচে চলে গেছেন, যাঁরা বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন, তাঁদের সহায়তায় বরাদ্দ নেই। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দুর্নীতি ও অপচয় রোধেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়লেও নতুন দারিদ্র্য নিরসনে তা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ নতুন যোগ হওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তুলনায় নিতান্ত অপ্রতুল।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দারিদ্র্য বাড়বে। উন্নয়ন অন্বেষণের হিসাব বলছে, লকডাউনের কারণে আয় কমে যাওয়ায় বা বন্ধ থাকায় ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার চেয়ে কম আয় করবে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতিতে ৪৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করবে। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে ফেরত এলে দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়া এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৩২ থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৫০ এবং পা’মা রেশিও ২ দশমিক ৯৩ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারি ব্যয় কমানো প্রসঙ্গে :
মন্ত্রী, সচিবসহ প্রজাতন্ত্রের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আধিকারিকের বেতন ও ভাতাদির ৩০ শতাংশ হ্রাস করা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে ৩০ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেওয়া। বাকি ৭০ শতাংশ প্রকল্পের ব্যয় ৩০ শতাংশ হ্রাস করা।সরকারের উন্নয়ন বা অনুন্নয়ন যেকোনো বাজেট থেকেই যানবাহন ক্রয়ের ওপর এক বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করা। সরকারি খরচে বিদেশে ভ্রমণ ব্যয় ৮০ শতাংশ কমানো যেতে পারে। বৈঠক, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের ক্ষেত্রে ভিডিও কনফারেন্স বা ওয়েবিনারের মাধ্যমে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা।

অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে ; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিল্পের কর্পোরেট কর কমানো, ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের সীমা বাড়ানো, জীবাণুনাশক যন্ত্রের কাঁচামালসহ বেশ কিছু আমদানি পণ্যের শুল্ক রেয়াত, কৃষিযন্ত্রের মূসক অব্যাহতি ইত্যাদি। প্রত্যাশা রাখি সংশোধিত বাজেটে উল্লেখিত বিষয়সমূহ বেশ গুরুত্ব পাবে।

লেখক: আদিত্য পিয়াস
কবি ও গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email