বৃহস্পতিবার, ২৮শে জানুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
বিশ্বব্যাপী  নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটুক
লেখক, আকিজ মাহমুদ
নভেম্বর ২৬, ২০২০,  ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ
বিশ্বব্যাপী  নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটুক

বিবর্তনের  মধ্য দিয়ে জগতের  নানান পরিবর্তনের সাথে সমাজ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনও লক্ষ্যণীয়।  আজকের পৃথিবীতে মানুষ উন্নয়নের সংজ্ঞা যেভাবে দিচ্ছে তাতে বরাবরের ন্যায়  প্রশ্ন থেকেই যায়। উন্নয়ন বলতে বর্তমান বিশ্বের সভ্য সমাজ কি বুঝাতে চায়? বড় বড় দালান, কনক্রিটের শহর নাকি যোগাযোগ ব্যবস্থার চূড়ান্ত উন্নতি? অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক উন্নয়ন মানুষের দৈনন্দিন  জীবনে সর্বস্ব প্রভাব বিস্তার করে। তথাপি আমাদের সভ্য  সমাজে উন্নয়নের পাশাপাশি  চলে নানা অপকর্ম। আত্মোন্নয়ন তথা নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ব্যতিত এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন আমাদের জীবনে কতটুকু ফলপ্রসূ তা যুক্তিতর্কহীনভাবে বলা সম্ভব নয়। অপরাধ এবং উন্নয়ন দুটি সাংঘর্ষিক বিষয় হলেও আপাত দৃষ্টিতে দুটোই ইদানিংকালে মোটেও সাংঘর্ষিক মনে হয় না। তবে এর মাঝে যে উন্নয়নটুকু হচ্ছে তা কেবল গোষ্ঠীগত, সামগ্রিক নয়।  কেননা এসব উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সবাই সামিল  হতে পারে না। ফলে দেশে ধনি এবং দরিদ্রের পার্থক্য প্রকট হচ্ছে দিন দিন। আর বৈশ্বিকভাবে চিন্তা করলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক সম্পদ মাত্র কয়েকজন ধনকুবের হাতেই সীমাবদ্ধ সর্বদা। ২০১৯ সালে  অক্সফামের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২ হাজার ১৫৩ জন বিলিয়োনিয়ারের সম্পদের পরিমাণ বিশ্বের  ৬০ শতাংশ মানুষের সম্পদকে ছাড়িয়ে গেছে।

ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত উন্নয়নের মাধ্যমেই অপকর্মের বিস্তার ঘটে না বরং অপকর্মের  জন্ম হয়ে থাকে বিভিন্ন উপায়ে। কিছু মানুষ নিজের উন্নয়নে (আর্থিক) অপকর্ম করছে, আবার কিছু আছে যারা নিজেদের ধ্বংস করতে অপরাধে লিপ্ত। অপকর্ম যেমনি হোক না কেন তা সর্বদা আত্মঘাতীই হয়ে থাকে। সমাজে অপকর্মের বৈধতা নেই তবুও এ সমাজ জীবনকে কেন্দ্র করেই প্রতিনিয়ত সংগঠিত হচ্ছে বিভিন্ন অপরাধ। একটা কিশোর বা যুবক স্কুলে কলেজে না গিয়ে মাদকপাড়ায় যাতায়াতে কেন অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, একজন মাদকসেবী নেশাগ্রস্ত হয়ে লঘুবুদ্ধিতে কেন অপরাধে শামিল হচ্ছে, তার দায় সমাজ এড়াতে পারে না। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, বর্তমান পৃথিবীতে আমরা সবাই কেবল উন্নতির দিকে ছুটছি  যা কেবল অর্থনৈতিকভাবে সুখে-স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপনের জন্য। ব্যক্তিবিশেষে নৈতিক উন্নতি সাধনে আমাদের কোন অগ্রগতি নেই। প্রকৃতপক্ষে সমাজ কিংবা পৃথিবীতে  নৈতিকতার আলো দীপ্তমান না হলে প্রকৃত শান্তি কামনা অর্থহীন।

আরব দেশে বেদুইনদের অরাজকতার জীবন যাপন পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট  সময় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। কিন্তু ইসলামি নৈতিকতার বিকাশ এবং ব্যক্তিক পর্যায়ে তার চূড়ান্ত প্রতিফলন তাদের যাযাবর জীবন থেকে পৃথিবীব্যাপী  রাজ্য এবং নৈতিকতার বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম করেছিল। যার ছাপ এখনো মানব সভ্যতার ইতিহাসে অমলিন।

সভ্যতার উন্নতি হতে হতে পৃথিবীর মানুষ মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব এবং বসবাসের ধ্যান-ধারণা নিয়ে লেগেছে, অথচ এদিকে নিজেদেন চেনা পরিচিত বাসযোগ্য পৃথিবীটা যে অশান্তিতে নিমজ্জিত তা নিয়ে কাজ করতে আমাদের আগ্রহ খুবই কম।  উন্নত শহরগুলোতে ঘন্টায় ঘণ্টায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি হচ্ছে, হচ্ছে নির্জন রক্ষনশীল গ্রামের নারীরা ধর্ষিত। আমেরিকা, রাশিয়া, বৃটেন কিংবা ভারত, বাংলাদেশ,   গরিব আফ্রিকা মহাদেশ, কোথাও যেন অস্তিত্বের ধারক হয়ে কেউ স্বস্তিতে নিঃশ্বাস টুকু নিতে পারছে না। শান্তির জন্য খ্যাত নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে মসজিদে ঝরে গেল অনকগুলো প্রাণ। অসাম্প্রদায়িকতার স্লোগানে মুখর ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও দেখা দেয় সাম্প্রদায়িকতার লাভা। কৃষ্ণাঙ্গ বলে আমেরিকার মত কথিত গণতান্ত্রীক দেশে চলে বর্ণবাদ।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষকে আয়েশি জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দিনরাত খাটিয়ে নিচ্ছে পুঁজিবাদীদের স্বার্থে। নৈতিকতার উন্নয়ন এবং বিকাশ যেন যান্ত্রিক এই পৃথিবীর সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে উঠতে পারছে না। বিশ্বে সকল মানুষ  ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছে একই সাথে একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। লক্ষ্য একটাই, আর্থিক সমৃদ্ধি।  এরই মাঝে কিছু মানুষ কল্পনার সীমাকে অতিক্রম করে অসম্ভকে সম্ভব করছে, আবার কিছু আছে যারা নৈতিকতা কে পাশ কাটিয়ে বর্বরতাকে উন্নতির সিঁড়ি হিসাবে বেছে নিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ করোনাকালে মানবিক হতে হবে, রক্তদানে এগিয়ে আসতে হবে

ঘণ্টায় ঘণ্টায় ধর্ষণ,ছিনতাই, চুরি, খুন,অপহরণ আমাদের নিত্যদিনের অসুবিধা। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিলোপ করা ব্যতিত মানবজীবন কল্যাণকর হয়ে উঠবে না। বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন তা দূর করতে পারেনি। দিন দিন কেবল এসব অপকর্মের বৃদ্ধি ঘটেছে। মানব কল্যাণের স্বার্থে বিশ্ববাসীকে নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত হতে হবে। হিংসাত্মক মনোভাব পরিহার করে বিশ্বব্যাপী  অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্তৃতি ঘটাতে হবে।

বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের মত সংস্থার মূল্যায়ন সর্বদা গৌণ থেকে যাবে যদি না বিশ্বব্যাপী ব্যক্তি পর্যায়ে নৈতিক আদর্শের বিপ্লব না ঘটে।  চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারে দাড়িয়ে বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে মানবতাবোধকে জিইয়ে রাখা।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইলঃ akijmahmud66@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন