রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
বৈরী জলবায়ু ও বিপন্ন কৃষি : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
জুলাই ২৬, ২০১৯
বৈরী জলবায়ু ও বিপন্ন কৃষি : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিখাত আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে বৈরী জলবায়ুর কারণে আমাদের কৃষিখাত হুমকির মুখে। এতে আমাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধাভোগী চক্র। তারা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য কিংবা তাদের দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে পণ্যসামগ্রী ও প্রযুক্তির ব্যবহারকেও প্রভাবিত করছে। দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে যদি ম্যাক্রো-পারিস্থিতি হিসাবে বিবেচনা করা হয় তাহলে বৈরী জলবায়ুর প্রভাবে কৃষি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক বিরূপ মাইক্রো-পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলোকে আমরা ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি।

 ১ . জলপ্রবাহ হ্রাসঃ
জলপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীর তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে গেছে । প্রতি বছরে ১২০ কোটি থেকে ২৪০ কোটি টন পলিমাটি বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। গঙ্গা এবং ব্রাহ্মপুত্রই বছরে ১শত ১৮ কোটি ৫০ লক্ষ টন পলি বহন করে,যার মধ্যে গঙ্গা ৩৮ শতাংশ এবং ব্রাহ্মপুত্র ৬২ শতাংশ। তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বন্যার প্রাদুর্ভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ আর শীতকালে পানিস্বল্পতার ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বন্যা আমাদের শষ্য,সম্পদ,সুপেয় পানি,অবকাঠামো,ভূমি ও পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। পেটের পীড়া ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে । দেখা দিচ্ছে খাদ্যঘাটতি, কমে আসছে প্রান্তিক কৃষকের আয়,বেড়ে যাচ্ছে দারিদ্র। পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো মেরামতের খরচও বেড়ে যাচ্ছে । বেড়ে যাচ্ছে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষার খরচ।

 ২ . অনিয়মিত বৃষ্টি এবং অতিবৃষ্টিঃ
বৈরী জলবায়ুর জন্য অনিয়মিত বৃষ্টিপাত,নিম্নচাপ,ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে,যার ফলে নদীভাঙনও বেড়েছে। তারই ফলশ্রুতিতে কৃষিজমি দিন দিন কমে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে প্রধানত বঙ্গোপসাগরের ৭৮০ কিলোমিটার লম্বা সমুদ্রতট ধরে ১৪টি জেলার প্রায় ৪০ হাজার ১ শত বর্গ কি .মি আয়তনের এই অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উলেখ্য যে আমাদের মোট জনসংখ্যার ২১.৭৯ । শতাংশ জনগোষ্ঠী ঐ অঞ্চল ঘিরে বসবাস করে।

গত তিন দশকের উৎপাদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায় :
চাউল ও গমের উৎপাদন ২০৫০ সাল নাগাদ যথাক্রমে ৮ % ও ৩২ % হারে হ্রাস পাবার আশংকা রয়েছ। একই হিসাব অনুযায়ী ভালবায়ু মৃদু পরিবর্তনের ফলে আউশ ধান উৎপাদন ২৭ শতাংশ এবং গম উৎপাদন ৬১ শতাংশ কমে যাবে। বৈরী জলবায়ুর প্রভাবে আদ্রতার উপর চাপ পড়বে ফলে বোরো ধানের উৎপাদনও ৫৫ থেকে ৬২ শতাংশ কমে যেতে পারে।

 ৩ . দীর্ঘায়িত গরমকালঃ
বৈরী জলবায়ুর প্রভাবে গরমকাল দীর্ঘ হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো আশঙ্কাজনক মাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলসমূহে খরা ও মঙ্গা বির্ভূত হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘায়িত গরম এবং আদ্রতার প্রভাবে সারাদেশে বিভিন্ন প্রকার রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। এসব বিরূপ প্রভাবে প্রধানত ভুক্তভোগী হচ্ছে দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে , –
From 1960 to 2007 , the annual rice production of Bangladesh has been increased from ৪.48 million to 31.05 ton . . . . Three types of crops, narmely aman , aus and boro are grown in this country. The contribution of arman, aus and boro to the annual food production is respectively 30.35 % , 0.57 % and 69.09 % . Boro , the main contributor to annual food production, is irrigation dependent rice and is grown in dry season i . e . January to May . Due to climate change , boro rice will be affected to a great extent . . . .

এর কারণ হচ্ছে স্বল্পবৃষ্টি,দীর্ঘায়িত গ্রীষ্মকাল,আর তার সূত্র ধরে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্থর নেমে যাওয়। আর এই নেমে যাওয়াতেই নদীপথে এবং ভূ-গর্ভে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ করছে। ফলশ্রুতিতে কৃষি জমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে,
. more than 300 thousand shallow tubewells ( STW ) rermain inoperative over 23, 389 sq km area that covers about 23.3 % and 5 , 9 % of the grss irrigated area and total area of the country respectively due to depletion of ground water table . This area called Critical STW Are , where water table , gobs below the suction limit of STW (7.60m) and remains for two to four weeks depending on the amount of natural precipitation . Sometimes Water table goes further down and remain between 7.6m to 11.3m . In this situation the farmers usually dig a pit and place irrigation equipment in it for getting water . But , water from the Surrouding irrigated lands is often collected in the pit through  Seepage and it becomes difficult to operate the diesel or electric STWs .’

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ,শ্যালো টিউবওয়েল কার্যক্ষমতা হারালে কৃষির প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এই  প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হবে তা আমরা মঙ্গা কবলিত অঞ্চলসমূহের দিকে তাকালেই বোঝতে পারি।

৪. লবণাক্ত পানি ও আনুষঙ্গিক বিষয়
অবাধে নোনা পানিতে চিংড়ি চাষ,আন্তর্জাতিক সুবিধাভোগী চক্রের পরামর্শের ভিত্তিতে কৃষিজমিতে চিংড়ি । চাষের সম্প্রসারণ এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন মৌসুমী ঘূর্ণিঝড় (আইলা,নার্গিস)-এ ভেঙ্গে পড়া বেড়িবাধ মেরামত না হওয়ার দরুন দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলার অধিকাংশ উপজেলার সিংহভাগ এলাকা নোনা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে এবং অদ্যাবধি নিমজ্জিত হয়ে আছে। আর এই অবস্থার ফলাফল হচ্ছে। ভূমি তার উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে আর কৃষক হারাচেছ তার কৃষিজমি । ।

.আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোতে নেতিবাচক প্রভাব
বৈরী জলবায়ু দীর্ঘমেয়াদী একটি প্রভাব ফেলছে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোতে। কৃষি আমাদের অর্থনীতির অতীব গুরুত্বপূর্ণ খাত। দেশের মোট উৎপাদনে (GDP)২৩ % ভূমিকা রাখে কৃষিখাত। শুধু তাই নয়,কৃষিখাত সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রথমেই এবং প্রধানত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষক,বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষক এবং অতি দরিদ্র মানুষেরা।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, বৈরী জলবায়ুর কারণে প্রতিনিয়ত আমরা নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের মুখোমুখি হচ্ছিঃ

ক.  আমরা ক্রমেই সংক্ষিপ্ত শীতকাল ও দীর্ঘায়িত গরমকালের দিকে যাচ্ছি। এর ফলে গ্রীষ্মকালে অনেক শষ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু শীতকাল কমে যাওয়ার ফলে বোরো ধান ও রবি শষ্যের উপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

খ. রাত্রিকালীন তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ধানগাছ বড় হয়ে উঠা এবং ধানের কার্ণেল (Kernel)বৃদ্ধিতে     মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। আড়র্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (I . R . R . I)ফিলিপাইন -এ ৬    ধরনের। বিভিন্ন ধানের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে ,প্রতি ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ধানের    ভিতরে চাউলের বৃদ্ধি হার ১০% কমে যেতে থাকে। এই গবেষণার মাধ্যমে সরাসরি এই ধারণাটি পাওয়া    গেছে যে বৈরী জলবায়ুর জন্য রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আমাদের ধান উৎপাদন প্রক্রিয়াকে উত্তরোত্তর     আশংকাজনকভাবে ক্ষতি করছে। আর তারই ফলশ্রুতিতে ফসলের স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রন্থ    হচ্ছে এবং বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে।

গ . ভৌত অবকাঠামোর আর একটি দিক হচ্ছে বেড়িবাঁধ, বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে যোগাযোগ    ব্যবস্থার অবনতি ঘটছে। পাশাপাশি বন্যা আর অতিবৃষ্টির ফলে যে সমস্ত সড়ক ও জনপদ একবার ধসে   যায় ত স্থানীয় সরকারের পক্ষে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত করা হয়ে ওঠে না। বরাদ্দ,দান,অনুদান     ইত্যাদি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আসতে আসতে কৃষক তার উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায় এবং অন্য   পেশার দিক ঝোঁকে অথবা শহরমুখী হয়ে ওঠে। এই প্রবাহটি আমাদের দেশে বেড়েই চলছে।

ঘ. বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (BADC)-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে,দক্ষিণ অঞ্চলের তিনটি উপজেলা তালা, সাতক্ষীরা ও দিভাটায় ভূ-গর্ভ লবণাক্ততা বেড়েছে ৫০০০ মাইক্রো সিমেন / বর্গ সে . মি .’এটা আমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছে যে ,সমুদ্রের পানি বাংলাদেশের   উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উপরিউক্ত উপজেলাগুলির মধ্যে তালা সমুদ্র থেকে মাত্র ৯০ কি .মি . দুরত্বে    রয়েছে । স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায় রাজধানী ঢাকা অথবা খুলনা বিভাগীয় শহর আর কত দূর ?

পরিশেষে বলা যায়, বৈরী জলবায়ুর প্রধান কারণ হিসাবে গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনকেই সাধারণত দায়ী করা হয় । এর কারণেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি , নিমচাপ ,ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস,ব্যাপকমাত্রায় নদীভাঙ্গন ,ভু-গর্ভস্থ পবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদি আশঙ্কাজনক স্তরে পৌছাচ্ছে। কিন্তু এই গ্যাস নির্গমনের জন্য বাংলাদেশ ততটা দায়ি নয় । এর জন্য দায়ি মূলত শিল্পোন্নত দেশগু্লো। বাংলাদেশ যেহেতু কৃষিপ্রধান দেশ এবং এর শিল্পখাত কৃষির সাথে যতটা যুক্ত হবে ততটাই দেশের স্থায়ী উন্নয়ন হবে সে-কারণে বৈরী জলবায়ু দেশের স্থায়ী উন্নয়নেরব জন্য এক ভয়াবহ প্রতিবন্ধ।  মনে রাখা দরকার বৈ্রী জলবায়ু-সৃষ্ট দুর্যোগগুলো একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর মধ্য দিয়েই আমাদের কৃষিকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের অর্জিত জ্ঞান যেন আমলরা সহজে প্রয়োগ করতে পারি। তথ্য ও তত্ত্ব যেভাবে এক অঞ্চল ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে তা যেন অন্য অঞ্চলে সহজে পেতে পারে । তথ্য যত তাড়াতাড়ি আমরা পাবো,ব্যবহার করবো,অনুমান করবো এবং  প্রয়োগের সাথে তুলনা করতে পারবো ততই দ্রুত আমাদের কৃষিখাত এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ উন্নতির দিকে অগ্রসর হতে পারবে।

রাখাল রাহা

Print Friendly, PDF & Email