বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
ভালো থেকো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জুন ১০, ২০২০,  ৭:৫০ অপরাহ্ণ
ভালো থেকো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সকাল ৭ টা। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। গত সপ্তাহ থেকে প্রতিদিনই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই বাতাসের তোড়ে বৃষ্টির পানি এসে পড়ল। চায়ের সাথে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির পানিও তাই হজম করতে হলো। আশেপাশের রাস্তায় কেউ নেই, থাকার কথাও না। এমনিতেই লকডাউন, তার উপর আবার মুষলধারে বৃষ্টি। কেমন যেন একটা মন খারাপের সুর চারদিকে। অবশ্য বর্ষার দিনগুলোই এমন। ভীষণ বিষণ্ণ, স্মৃতিকাতরতায় ভরপুর।

অনেকদিন পর ছেলেবেলার মতো এ বছরের বৃষ্টির দিনগুলোও ঘরে বসেই কাটছে। সারাদিন ঘরে থেকে চুপচাপ অবিরাম বৃষ্টি দেখে যাওয়া। সচরাচর বর্ষার দিনগুলো এভাবেই কাটতো বাসায়। তবে গত বর্ষাটা কেটেছিল ক্যাম্পাসে, প্রতিবারের চেয়ে একটু আলাদাভাবে। সেবার জুন মাসে ছিল সেমিস্টার ফাইনাল। রোযার ইদের অল্প কয়েকদিন পরেই তাই হলে ফিরতে হয়। তখন ক্যাম্পাস একদম ফাঁকা, দু’চারটি বিভাগ ছাড়া প্রায় সবার ইদের ছুটি চলছে। এই বিশাল ক্যাম্পাসে অবসর সময়গুলো তাই একা একাই কাটতো। আর সেই নির্জনতার ভীড়ে বন্ধু ছিল বর্ষার এই বৃষ্টি।

বিকেলে, সন্ধ্যায় একটু দমকা হাওয়া উঠলেই চলে যেতাম হলের ছাদে, কখনোবা মাঠে। মাঝে মাঝে ফুলার রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে বৃষ্টি নামত। মনে হতো যেন হাঁটছি না, স্বপ্নে বিচরণ করছি। চারদিকে আলো-আঁধারি পরিবেশ, একটু পর পর বজ্রপাতের আওয়াজ, ব্যস্ততার সড়কে নিস্তব্ধতা – কেমন যেন অদ্ভুত একটা সময়! আবার কোনো কোনোদিন কাটত ভীষণ ঘুমে। সকালে উঠেই দেখি বৃষ্টি, সাথে ঘন কুয়াশার মতো ধোঁয়াটে আবরণ চারদিকে। আবার ঘুমিয়ে যাই। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়, কিন্তু বৃষ্টি থামে না আর। ঘুম থেকে উঠে হলের দোকানে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খেয়ে আবার ঘুমাতে যাই, শরীর-মন সারাদিন থেকে যায় অবসন্ন। ক্যাম্পাসের বর্ষার স্মৃতিগুলো এমনই। কখনো শহীদুল্লাহ হলের পুকুর পাড়ে বসে চা খেতে খেতে ঝুম বৃষ্টি দেখা, কখনোবা টিএসসির মাঠে ভিজতে ভিজতে কখন যে গত বর্ষা চলে গিয়েছে টেরও পাইনি। এবার এসে বুঝলাম ক্যাম্পাসের বর্ষা মিস করছি, আর মিস করছি প্রিয় ক্যাম্পাসকে।

লকডাউনের এই সময়ে ঘর থেকে বেরুনোর উপায় নেই। এক শহরে, পাশাপাশি বাসায় থেকেও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার সুযোগ নেই। কয়েক বাসা পরেই করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে, দুশ্চিন্তাও মাথাচাড়া দিচ্ছে খুব বেশি। বদ্ধজীবনে বই, সিনেমা আর অনলাইন আড্ডা-ই একমাত্র সাথী। লকডাউনের শুরুর দিকে এই কয়েকটা জিনিস ভালো সঙ্গ দিলেও এখন এসে বিরক্তিকর ঠেকছে সবকিছু। একজিনিস দীর্ঘদিন কার-ই বা ভালো লাগে! আবার কিছু করারও নেই। বন্ধুদের সাথে পুরনো দিনগুলোর কথা ভেবেই তাই দিন পার করে দেই। রুটিনবিহীন হল জীবন, ক্লাস শেষে শ্যাডোর আড্ডা, ব্যস্ততম মধুর ক্যান্টিনে স্লোগানে গলা মেলানো, রাতভর সাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরি – ঘুরেফিরে সব আলোচনারই সারবস্তু এই ক্যাম্পাস লাইফ। যেখানে নিত্যদিনের বিচরণ, ভালো লাগা, খারাপ লাগার স্মৃতি মিশে আছে, সে প্রাঙ্গণ ছেড়ে এতদিন থাকতে হবে, কিংবা থাকলেও যে বারবার এই ক্যাম্পাসের কথা এত বেশি মনে পড়বে – সেটি কেউ ভাবেওনি। প্রতিদিনের মৃত্যুসংবাদ, করোনার ঊর্ধ্বগামী সংক্রমণের হার, অজানা আতংক, দুশ্চিন্তা আর শঙ্কা যখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে, তখন ক্যাম্পাসের এই স্মৃতিচারণ-ই এই প্রচণ্ড বিষাদে ঘেরা একঘেয়ে জীবনে শান্তির পরশ এনে দেয়। সবসময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোতে ক্যাম্পাসের ছবি খুঁজে ফিরি। শুধু আমিই না, সবাইকেই দেখেছি এই লকডাউনে আবদ্ধ ক্যাম্পাসের ছবি পেলে যেন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, বিষণ্ণতার মাঝেও যেন একটু সুখের সন্ধান পায়।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাড়ে তিনশ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছি। তারপরও প্রতিদিনই জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছে আমার চেনা চত্বর? কেমন আছে রাতের কার্জন হল কিংবা শেষরাতের ডিএমসির সামনের খাবারের দোকানগুলো? কেমন আছে রাতজাগা ভীষণ আলোকিত বিজনেস ফ্যাকাল্টি, কিংবা মুহসীন হলের ছোট্ট বাগানটি? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো যেন ক্যাম্পাসের ছবিগুলোর মধ্যেই খুঁজে পেতে চেষ্টা করি। কেউ কোনো কাজে ক্যাম্পাসের দিকে গেলেই বলি ছবি তুলে পাঠাতে। দূরে থেকেও মনে হয় কাছাকাছি আছি, ক্যাম্পাসেই আছি। এত খারাপের মাঝেও কিছুটা ভালো লাগা কাজ করে, আবার এর সাথে জড়িয়ে থাকে গভীর দীর্ঘশ্বাস, অজানা আগামীর আশংকা। জানি না কবে সবার ফেরা হবে। অনেকেই হয়তো ফিরবে না, কতকিছু বদলে যাবে। কিন্তু তারপরও এই যে একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে আছি এর তো কোনো শেষ নেই, এর কোনো শেষ থাকতে পারে না। তাই এতদূর থেকেও ক্যাম্পাসের ছবিগুলো দেখলেই মনের অজান্তে বলে উঠি, ভালো থেকো টিএসসি, ভালো থেকো হাকিম চত্বর, ভালো থেকো কার্জনহল আর ভালো থেকো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক, ফারহান ইশরাক
শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন