মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৪ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
মহীয়সী এক নারীর জয়জয়কার: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল
মে ১২, ২০২০,  ৩:১৮ অপরাহ্ণ
মহীয়সী এক নারীর জয়জয়কার: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (মে ১২, ১৮২০ – আগষ্ট, ১৯১০) ছিলেন আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, একজন লেখক এবং পরিসংখ্যানবিদ। যিনি ‘ দ্যা লেডি ইউথ দ্যা ল্যাম্প ’ নামে পরিচিত ছিলেন।

জন্ম : বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেলের অভিজাত পরিবারে ১৮২০ সালের ১২ মে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

কর্মজীবন : তার জীবদ্দশায় তিনি ১৮৫৩ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনের ‘কেয়ার অব সিক জেন্টলওমেন ইনিস্টিটিউটের’ তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কাজ করে গেছেন। ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য কাজ শুরু করেন। নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিঙ্গেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর গবেষণা চালান। যা ভারতবর্ষে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবদান রাখে।
বিশেষ ভূমিকা : ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির’ প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশারূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং ।

প্রকাশিত বই : ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সাথে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় নার্সিংয়ের উপর বইও লিখেছেন।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ফ্লোরেন্স এর অবদান :
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান ছিল ক্রিমিয়ার যুদ্ধে , যখন ব্রিটেনে যুদ্ধাহতদের করুণ অবস্থার বিবরণ আসে তখন এটি তার চিন্তার মূল বিষয় হয়ে দাড়ায়। ১৮৫৪ সালের ২১ অক্টোবর তিনি এবং তার কাছেই প্রশিক্ষিত ৩৮ জন সেবিকা, তার আত্মীয় মেই স্মিথ এবং ১৫ ক্যাথোলিক নান সহ (হেনরি এডওয়ার্ড ম্যানিং এর দিক নির্দেশনায়) (সিডনী হারবার্টের তত্ত্বাবধানে) অটোম্যান সাম্রাজ্যে যান। নাইটিংগেল প্যারিসে তার বান্ধবী মেরী ক্লাকের সহযোগিতা পেয়েছিলেন।তাদের ক্রিমিয়ার ব্লাক্লাভার ব্লাক সি এর ২৯৫ নটিক্যাল মাইল (৫৪৬ কিমি; ৩৩৯ মা) এলাকা জুড়ে প্রেরণ করা হয়, যেখানে ব্রিটিশদের মূল ঘাঁটি ছিল।

নাইটিঙ্গেল ১৮৫৪ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকে স্কুটারির (বর্তমানে ইস্তানবুল -এ অবস্থিত ) সেলিমিয়ে ব্যারাকে উপস্থিত হন। তার দল দেখতে পায় প্রশাসনিক অবহেলার জন্য দায়িত্বের বোঝায় পৃষ্ঠ মেডিকেল টিম যুদ্ধাহতদের ভাল যত্ন নিতে পারছিল না। ওষুধের ঘাটতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, রোগের সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রোগীদের খাবার তৈরির বিশেষায়িত ব্যবস্থা ছিল না।

পরবর্তী জীবন : তার অবদান স্মরণ রাখতে ১৮৫৫ সালের ২৯ নভেম্বর ক্রিমিয়ায় সেবিকাদের প্রশিক্ষণের জন্য নাইটিঙ্গেল ফান্ড গঠন করা হয়। সেখানে প্রচুর সাহায্য আসতে থাকে। সিডনী হারবার্ট ফান্ডের সচিব এবং ডিউক অব ক্যামব্রিজ এর চেয়ারম্যান হন। নাইটিঙ্গেলকে মেডিকেল ট্যুরিজম এর অগ্রদূত ভাবা হয়, ১৮৫৬ সালে অটোম্যান সাম্রাজ্যের স্পা বর্ণনা করে তার চিঠি গুলোর জন্য। তিনি সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানান দিক তুলে ধরেন্ন যেগুলো সুইজারল্যান্ডের তুলনায় সস্তা ছিল।

প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা : নাইটিঙ্গেল সেন্ট থোমাস হাসপাতাল এ নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য নাইটিঙ্গেল ফান্ড থেকে ৮৫ হাজার ফ্রাংক পান। এখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সেবিকাগণ ১৮৬৫ সালের ১৬ মে থেকে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং এন্ড মিডওয়াইফারি ,কিংস কলেজ অব লন্ডন এর একটি অংশ। তিনি আইলেসবারিতে তার বোনের বাড়ি ক্লেডন হাউসের কাছে অবস্থিত রয়েল বাকিংহামশায়ার হাসপাতাল এর জন্য ও অনুদান সংগ্রহ করেন।

লেখালেখি : নাইটিঙ্গেল নোটস অব নার্সিং নামক বই লিখেন (১৮৫৯)। এই বই নাইটিঙ্গেল স্কুল সহ অন্যান্য নার্সিং স্কুলে পাঠ্যসূচীর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে যদি এটা বাড়িতে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য লেখা হয়েছিল। নাইটিংগেল লিখেন ” প্রতিদিন পরিষ্কার থাকার জ্ঞান, অথবা নার্সিং এর জ্ঞান অন্য কথায় কিছু নিয়মাবলী যা নিয়ে যাবে রোগমুক্ত অবস্থায় অথবা রোগ থেকে মুক্ত করবে, আরও ভাল করবে, এটা সার্বজনীন জ্ঞান যা সবার থাকা উচিত, চিকিৎসা শাস্ত্র থেকে কিছুটা আলাদা যেটি নির্দিষ্ট পেশার মানুষে সীমাবদ্ধ।

পদবী লাভ : তিনি অসংখ্য পদক আর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ১৮৮৩ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদক প্রদান করেন। প্রথম নারী হিসাবে ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি। এ ছাড়াও ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’। যার মধ্যেমে সম্মান জানানো হয় এক নারীকে যিনি তার কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন- নার্সিং একটি পেশা নয় সেবা।

জীবনাবসান ও মৃত্যু : ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন যাত্রী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।

লেখক : রশিদুল আলম, সাবেক শিক্ষার্থী, আইএমটি সিরাজগঞ্জ ও বর্তমানে আইইবিতে যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগে অধ্যায়নরত।

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন