বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর ২০২০ ইং, ১৬ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
যার আছে তার আছে, যার নেই তার নেই
নভেম্বর ১৭, ২০১৯,  ১০:৪০ অপরাহ্ণ
যার আছে তার আছে, যার নেই তার নেই

২০১৯ সাল এপ্রিলের প্রায় শেষ। বিকেলে প্রতিদিনের ন্যায় আজকেও টিউশনি করাতে গিয়েছিলাম। আমার টিউশনটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার ঠিক চার কিংবা পাঁচ বাড়ি পর। দুই জনকে একসাথে পড়াই। একটা ছেলে দশম শ্রেণি আর একটা মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। পড়ানো শেষে একটা অটো গাড়িতে করে ক্যাম্পাসের দিকে ফিরছিলাম। সময়টা গোধূলি বেলা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে নামার সময় আমার বন্ধু রাজনকে দেখলাম মেইনগেট দিয়ে প্রবেশ করছে। আমি ওকে ডাক দিলাম। কিন্তু রাজন শুনতে পেল না। যাই হোক, আমি যে কারনে মেইন গেটে নামলাম তা হল একটা হোয়াইট বোর্ড মার্কার কিনবো (সিগমা)। সেটা কিনলাম ৩০ টাকা দিয়ে। কিনে রাজনকে ফোন দিলাম।

হ্যালো, রাজন তুই মেইন গেটে ঢুকলি দেখলাম। আমিও এখানেই। তুই একটু দাড়া, অথবা একটু পিছিয়ে আয়। রাজন পিছিয়ে আসল। বললাম, কিরে এত্ত জোরে জোরে ডাকছি কানে শুনিস না? রাজন তার হাতটা আমার কাছে এগিয়ে দিল হ্যান্ডসেক করার জন্য। রাজনও পড়াতে গিয়েছিল, ওর পড়ানোও শেষ। সে বলল, চল হাটি? আমি বললাম চল শহিদ মিনারের উপরে গিয়ে বসি। অনেক দিন হল বসা হয় না। ঠিক আছে চল, রাজন জবাব দিল। শহিদ মিনারের সিড়ির পাশেই লেখা ছিল জুতা পায়ে পরে উঠা নিষেধ। আমরা জুতা খুলে উঠলাম। ওরে বাপরে সিড়ি যা গরম! আজকের দিনে কুষ্টিয়ার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি পেরিয়ে। তাই শহিদ মিনার প্রচুর গরম হয়ে আছে,যেন পা রাখা যাচ্ছে না। তবুও কিছুক্ষণ বসে রইলাম। আমাদের মত আরও অনেকেই ছিল। রাজন বলল, নারে এত্ত গরমে আর এখানে থাকা গেল না, চল মাঠে বসি। আমারও বসে থাকা কষ্টকর ছিল তাই মাঠের দিকে গিয়ে বসলাম। মাঠে বসতে না বসতেই রাজন তার শার্ট খুলে ফেলল। রাজন আমার মতই হালকা-পাতলা। তবে আমার চেয়ে একটু মোটাতাজা হবে। রাজন ডিপার্টমেন্টের এক সময় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল। এখন অবশ্য তা ধরে রাখতে পারেনি। তবে রাজনের সিজিপিএ আমার সিজিপিএ এর চেয়ে অনেকটাই ভাল। অল্প কথার ব্যক্তি সে পুরাই সাদামাদা এবং ঘুরাফিরা একটু কমই করে।

দুজনেই টিউশন থেকে এসে ক্লান্ত তাই আরামে মাঠে নিজেদের মত বসে পরলাম। বসেই রাজন আমায় জিজ্ঞেস করল, তারপর তোর কি অবস্থা ? আমি বললাম, ভাল না থাকলেও আমায় সব সময়ের জন্য ভাল থাকার চেষ্টা করতে হবে। তাই নাকি, রাজন গলাটা ঝেরে বলল।

তারপর দুজনে নিজেদের ডিপার্টমেন্ট নিয়ে অনেক আলোচনা করলাম, নিজেদের ডিপার্টমেন্ট এর নামে অনেক দুর্নাম করা হল। এক পর্যায়ে আমি বললাম, এই রাজন তোর বাবা নাকি অসুস্থ? গত সপ্তাহে বলছিলি আমায়। বাবার কথাটা শোনা মাত্রই রাজনের উজ্জল চেহারা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম অবস্থা খুব একটা ভাল না ।

তোর বাবার বয়স কত রে? প্রশ্নটা আমি করে বসলাম। রাজন বলল, ৮০ বছর পেরিয়ে। ৮০ বছর !! তোর বাবার বয়স ৮০+ বছর!  শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। যেখানে আমার বাবার বয়স ৪৩ বছর সেখানে রাজনের বাবার বয়স ৮০বছর। বিষয়টা কেমন যেন লাগছে আমার ।

আমি বললাম, তোরা কয় ভাই-বোন? রাজন বলল, আমাদের পরিবারের অনেক বড় ইতিহাস আছেরে। আমি কৌতূহল প্রকাশ করলাম, বললাম বলা যাবে? আমি আসলে এসব বিষয় কাউকে বলি না,আমাকে উপরে উপরে সবাই জানে যে আমি একজন সুখি মানুষ। কিন্তু আমার ভেতরের খবর কাউকে জানতে বা বুঝতে দেই না। কথাগুলো রাজন বলছিল একদম নিচু গলার আওয়াজে।

আচ্ছা তোকে বলব, তুই যেন আবার কাউকে বলিস না।

আমি বললাম, আরে নাহ।

‘রাজন এবার তার পরিবারের সম্পর্কে বলা শুরু করল’

আমার বাবার দুইটা পক্ষ। বাবা প্রথমে যাকে বিবাহ করেছিল সে মারা যাবার পর আরেকটা বিবাহ করে। সে পক্ষে তার দুইটি ছেলে আর একটি মেয়ে। তখন আমি পৃথিবীতে নেই। যা বলছি সব তার মায়ের কাছে শোনা কথা। ছেলে-মেয়ে গুলো খুবই ছোট ছোট। তাদের কোনো কিছু ভাল বুঝিবার মত ক্ষমতা হয় নি তখনও। তবে তারা তিন ভাই-বোনই স্কুলে যায়। মা হারা তিন ভাই-বোনকে দেখা-শুনা করার জন্যই বাবা আরেকটা বিবাহ করেছেন। বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিল। তবে আমি কখনও বাবার স্কুলে গিয়ে ক্লাস নেওয়া দেখে নি। আমার জন্মের অনেক আগেই সে অবসর গ্রহন করেছে।

মা বলেছে, ছোটবেলায় সৎ মা ছিলাম না ওদের কাছে। আমার মায়ের তখনও নিজের কোনো সন্তান ছিল না। তাই তাদের নিজের সন্তানের মত লালন-পালন করে বড় করার চেষ্টা করেছেন। তারা তিন জনই স্কুলে যায়। ভালই মা মা বলে ডাকে । তারাও যেন তাদের নিজের মাকে ফিরে পেয়েছে।

তাদের আচরনে তাই মনে হয়। সব মিলিয়ে পরিবারে সর্বসুখ বিরাজমান। ও দিকে আব্বাও প্রধান শিক্ষক, সবাই আব্বাকে মাস্টার বলে সম্বোধন করে। গ্রামে আব্বার অনেক সুনাম।

ছেলে-মেয়েগুলো বড় হতে লাগল। এক এক করে সবাই এসএসসি পাশ করল তারপর এইচএসসি পাশ করল। আমি তখনও পৃথিবীর বুকে নেই। একরাতে আমার আব্বা-মা শুয়ে গল্প করছে । আব্বা বলছে মাকে,আচ্ছা তোমার তো নিজের কোনো সন্তান নেই? তিন ছেলে-মেয়ে যখন বড় হবে, বিবাহ করবে তখন যদি ওরা তোমায় না দেখে? হাজার হোক সৎ মা তুমি। সৎ ছেলে-মেয়ের উপর তোমার এতটা নির্ভর করা উচিৎ হবে না। মা বললেন তা ঠিক তবে এই বুড়া বয়সে সন্তান!

আর না নিয়েও তো চলছে না আব্বা বললেন। তারপর আমার জন্ম হয়। এদিকে আমার বড় ভাই-বোন সবাই আইয়ে পাশ করে বসে আছে। বোনটার বিবাহের প্রস্তাব আসে এক ব্যবসায়ির নিকট হতে। আমার বাবা আমার বোনের বিবাহ দিয়ে দেয়।

সংসারটা কেমন যেন পাতলা হয়ে গেল। মানুষ যেমন একজন কমে গেল সাথে সাথে সংসারে উদ্ধৃত্ত টাকাটাও শেষ হয়ে গেল। আমার দুই ভাই বিবাহ করার জন্য বাড়িতে প্রস্তাব দেওয়ায় তাদেরও বিবাহ করানো হল। আর হ্যা,  দুর্ভিক্ষ আর হতাশা যেন সেখান থেকেই শুরু। আমি তখন ৭ম শ্রেণির ছাত্র। দুই ভাইয়ের বউ আর প্রতিবেশির চাপে ভাইয়েরা আর আগের মত নাই। ক্রমশ তারা বাবা- মায়ের প্রতি রুক্ষ আচরন করছে। মাঝে মাঝে ঝগড়াও হয়।

হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম বড় ভাই আর আমার চাচা মিলে বাবাকে মারবে। না শুধু মারবে যে তা নয়, একবারে মেরে ফেলবে। সন্ধ্যার একটু আধটু পরে মা ঘর থেকে কিসের জন্যে যেন বাহিরে বের হয়। ঠিক তখনই দরজার পাশে দেখে তার বড় ছেলে বাবাকে মারা জন্যে রামদা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই যেন শেষ করে দিবে। মা আবার বিষয়টা বুঝতে পেরে বাবাকে অন্য দরজা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেয়। বাবা কোনো রকম সেদিনের জন্যে বেঁচে যায়। তারপর থেকে বাবা সব সময় আতঙ্কে থাকে, কখন না জানি তার ছেলে তাকে মেরে ফেলে। একজন মাস্টার এর ছেলে হয়ে দুজনই মদ, গাজা আরও অনেক কিছু খায়। সম্ভবত সেদিন একটু বেশি খাওয়ার কারনেই বাবাকে মারার জন্যে গিয়েছিল।

বাবা ঐ দিনের পর থেকে ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পরেছেন। মাস খানেক পর আমার ছোট ভাইয়ের বউ বাবার সাথে ঝগড়া বাধায়। তুমুল ঝগড়া! এক পর্যায়ে তা মারামারিতে পরিনত হল । সবাই একদিকে, আমার বাবা-মা অন্যদিকে। পেছন থেকে আমার বড় ভাই বড় একটা লাঠি দিয়ে বাবার মাথা বরাবর একটা পিটান দেয়। পাশের একজন সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছু হয় না, উনি লাঠিটা ধরেছিলেন । তার জন্যই হয়তবা আমি আজও আমার বাবার মুখ দেখতে পাচ্ছি।

বাবা তখন দেখলেন অবস্থা ক্রমশ ভয়াবহ রূপ ধারন করছে তখন তিনি আর উপায় না বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যান ওখান থেকে। আমি তখন স্কুলে। আমার স্কুলে আসার জন্যে একটা ছোট নদী পাড়ি দিতে হয়।

বাবা নদীটা কোনো রকম নৌকা দিয়ে পাড়ি দিয়ে আমার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে বললেন, আমি কি আমার ছেলেকে নিয়ে যেত পারব? ওর ছুটি লাগবে। হ্যাঁ অবশ্যই পারবেন। বাবাকে কেমন যেন বিমর্ষ দেখালো। বয়স হয় নি এত কিছু বুঝে ওঠার। তবুও যতটুকু বুঝেছিলাম বাবা খুব বিপদের মধ্যে আছে। বাবা আমার হাত ধরে বললেন,স্যারকে একটা সালাম দিয়ে এসো। আমি বাবার কথায় স্যারকে একটা মৃদুস্বরে সালাম দিলাম। স্যার আমার মাথায় হাত রেখে বললেন সুখে থেক। আমি মনে মনে বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। বাবা হয়ত স্যারের সাথে তার সমস্যা কিছুটা শেয়ার করেছে।

তারপর বাবা কাঁদো কাঁদো অবস্থায় বলল, চল। আমি বাবার কথায় হাঁটা শুরু করলাম। বাবা, মাকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল নদীর পাড়ে। ও হ্যাঁ একটা বিষয় বলতে ভুলে গিয়েছি। স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবা বলেছিল, স্কুলটার কথা তোর খুব মনে পড়বে তাই না? আমি বিষয়টা না বুঝে বাবাকে বললাম, কেন বাবা? বাবা বলল, আমাদের আর এ গ্রামে থাকা হবে না। আমরা পাবনা চলে যাব। এখানে থাকা খুবই বিপদজ্জনক। তোর ভাইয়েরা আমায় হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। যখন-তখন আমায় মেরে ফেলতে পারে। তখন তোর আর তোর মায়ের কি হবে? তাই আমরা চলে যাচ্ছি। আমি মনে মনে ভাবছি বাবাকে ভাইয়েরা কেন মারবে? বাবার অপরাধ কি? কিন্তু আমি ছোট ছিলাম বলে বিষয়টা আমার অজানা রয়েই গেল। আজ বুঝতে পারছি কেন বাবাকে মারতে চেয়েছিল।

যাইহোক, বাবার কথামত মা নদীর পাড়ে দাড়িয়ে আছে। আমরা যাওয়ার পর নৌকায় উঠতেই নৌকা ছেড়ে দিল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আর বুঝি এই বিদ্যালয়ে পড়তে পারব না। শেষবারের মত হয়ত বা আজকেই ছিল।। বাবা মাঝিকে বললেন, ভাই একটু দ্রুত যাও। মাঝি নৌকা অতি দ্রুত চালিয়ে আমাদের পাড় করে দিলেন।

আমরা নতুন বাড়ি্তে উঠলাম মাত্র তিনজন। আমি আর মা-বাবা। পূর্বের বাড়িতে আমরা অনেকেই ছিলাম। সেই জন্যে নতুন বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মা কেমন যেন হতাশা বোধ করছেন। ছেলেগুলোর জন্যে মা কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে্ন। বাবা তখন মাক বলল, তুমি কিসের এত টেনশন করছ? যে ছেলেরা সম্পত্তির জন্যে আপন বাবাকে হত্যা করতে পারে তাদের জন্যে দু ফোটা অযথা পানি কেন ঝরাচ্ছো। ওরা আর মানুষ হবে না।

সে দিন ঘনিয়ে গেছে। বাবা যখন কথাগুলো মাকে বলছিল,বাবার মুখ পুরোটা লালবর্ণ ধারন করেছিল। মা তখন বলল, তাহলে তুমি ঐসব ছেলের জন্যে এখন কাঁদছো কেন? কই আমি তো কাদছিনা। এমনি হয়ত বা চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। এমনি কি কখনও চোখ দিয়ে পানি ঝরে। মা বলল, আমি বুঝিনা মনে করেছে। বাবা তখন উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে মাকে জরিয়ে ধরে হাউ-মাউ করে কাঁদতে লাগল। আর বলতে লাগল ছেলে মেয়েদের জন্যে কত্ত কষ্ট করে এত কিছু করলাম আর তারা আজ আমায় তার প্রতিদান হিসেবে হত্যা করতে চায়। হয়ত বা আমি মানুষটা ভাল না। বড় ধরনের পাপ করেছি জীবনে ছেলে মেয়েদের জন্যে কষ্ট করে। বাইরে থেকে সব শুনছি আমি। কিন্তু আমি কি তখন এত কিছু বুঝি? তারপর থেকে বাবা- মা প্রায়ই কাঁদে।

আমাকে বাবা পাবনা একটা স্কুলে ভর্তি করে দিল। অষ্টম শ্রেণিতে আমি ভাল রেজাল্ট করলাম। বাবা-মা অনেক খুশি হয়েছিল। কিন্তু বাবা হঠাৎ মাকে বলে উঠলো, আরে ভাল রেজাল্ট তো তোমার বাকি সন্তানেরাও করেছিল। তারা যেমন হয়েছিল রাজন তাদের মতই একজন হয়ে যাবে। আমরা যে অধম সে অধমই থেকে যাব। কথাগুলো শুনে আমার অন্তর ছিড়ে যাচ্ছিল। মনে মনে ভাবলাম,বাবার ধারনা আমি পাল্টে দিব। আমি দেখিয়ে দিব সবাই সমান হয় না।

সেই থেকে আমি তুখোর থেকে তুখোরভাবে পড়াশোনায় লিপ্ত হলাম। কে রোধে আমায়। আমি চলে যাব দুর বহূদুর, আর এর পেছনের একমাত্র অহংকার হবে আমার বাকি ভাইগুলো। তাদের কাছে থেকে আমি শিখে নিলাম বড়রা ভূল করলেও ছোটরা যে ভূল করবে এমনটা ভাবা অনুচিৎ। আমি হব তারই প্রতিফলন।

এস এস সি তে ভাল একটা রেজাল্ট করে শহরের সবচেয়ে বড় কলেজে ভর্তি হলাম। কিছুদিন খুব কষ্ট হচ্ছিল। তারপর সব ঠিক হয়ে গেল।

কিন্তু হঠাৎ বাবার অসুস্থতা ক্রমশ কেমন যেন বেড়েই চলছে। কলেজ থেকে এসেই শুনি বাবার নাকি ডান হাত আর ডান পায়ে শক্তি পাচ্ছে না। কথাটা শুনে আমি যেন নির্বাক হয়ে গেলাম।

বাবা আমাকে ডেকে বললেন,বাবা রাজন আমি হঠাৎ মারা গেলে তোর মাকে দেখার দায়িত্ব নিস। অন্যসব ভাইদের মত হোস না যেন। তাহলে তোর মায়ের আর দেখার মত কেউ থাকবে না। বাবার পাশে এর আগে এমন করে কখনও বসি নি আমি। আজ যেন কেমন বাবাকে অতি আপন থেকে আরও আপন লাগছে। জানি না বাবাকে আর কতদিন পাব। মা একদিন বাবাকে বলছে তোমার ছেলে-মেয়েকে খবর দেওয়া হয়েছে। তোমার অসুখের কথা বলেছি, আরও বলেছি তুমি হয়ত বা আর বেশিদিন বাঁচবে না। বলেছি তো প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল তবুও তারা এলো না। বাবা বললেন,ওরে সিমারের বুকে কি কখনও ভালবাসা জন্মায়!  তা হোক বাবার জন্য কিংবা অন্য কারও জন্যে। বলতে না বলতেই বাবা অঝোরে কেঁদে উঠে বললেন, ছেলে-মেয়দের কতদিন হল দেখিনা, একবার কাছে পেলে মন-প্রাণ ভরে দেখতাম। শুনেছি ছোট ছেলেটার নাকি ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান হয়েছে। তাকেও একটি বারের জন্যেও দেখিনি।

মা বললেন,বড় ছেলেটার ঘরে একটা রাজ কপাল ওয়ালা রাজপুত্তর জন্ম গ্রহন করেছে। হায়রে কপাল আমার, শেষ বয়সেও কোনো নাতি-নাতনির মূখ দেখতে পারলাম না। জীবনে অনেক কিছু বকেয়া রয়ে গেল।

ইতিমধ্যে আমার এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। বরাবরের ন্যায় এবারও রেজাল্ট ভাল করলাম। কিন্তু মনে কোনো প্রকার আনন্দ নেই, নেই সুখ কিংবা একফোটা হাসির ছাপ। যার ঘরে বেদনা,তার সর্বাঙ্গে বেদনা। আমারও ঠিক তাই। রেজাল্ট পেয়ে বাবার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে কানের কাছে গিয়ে বললাম , বাবা আমি এইচ এস সি পরীক্ষায় জিপিএ ৫.০০ পেয়েছি। বাবা একটুখানি মুচকি হাসি দিয়েছিলেন। আর সেটাই ছিল বাবার শেষ হাসি তারপর বাবার হাসি আমি আর দেখিনি।

আমার রেজাল্ট ভালোর কথা শুনে পাশের এক বড় ভাই এসে আমায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে শোনালেন। ঐ ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়ছে। সে এখন ফাইনাল ইয়ারে। তাই হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কে অনেকটাই বেশি জানেন। ভাই নিজে গিয়ে আমায় একটা এডমিশন কোচিং এ ভর্তি করে দিলেন। আমি ৩ মাস কোচিং করলাম। তারপর শুরু হলো ভর্তি পরীক্ষা। বাবাকে বললাম, বাবা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি,তুমি আমার জন্যে দোয়া করো। বাবা কথাটা শুনে যতটুকু পারেন চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। সাথে সাথে বললেন,প্রত্যেকটা বোর্ড পরীক্ষায় আমি তোর সাথে যেতাম। তুই পরীক্ষা দিতি আর আমি কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করতাম। আর সবার সাথে গল্প করতাম আমার ছেলে পরীক্ষা দিচ্ছে। বিশ্বাস করো বাবা রাজন, তুমি যখন কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শেষ করে বাইরে আসতা, তোমাকে দেখে আমার যে কি আনন্দ হত। দৌড়ে তোমার কাছে যেতাম,অতি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইতাম তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে। তুমি বরাবরই বলতা জ্বি বাবা অনেক ভাল হয়েছে।

বাবা বলছিল,আমি ছাত্র হিসেবে ছিলাম খারাপ । কিন্তু আমার ছেলে রাজন আমার চেয়ে হাজরও গুণে ভাল ছাত্র। এ আমার অহংকারের বিষয়। আমি কোনো পরীক্ষায় কখনও ফার্স্ট হতে পারি নি। আর তুমি ফার্স্ট না হতে পারলে রেগে যেতে । তোমার মধ্যে আমি মোমবাতির ন্যায় আলো দেখতে পাচ্ছি। যাও পরীক্ষা দিয়ে আসো।

বাবা-মায়ের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গেলাম। পরীক্ষার কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষ। পরীক্ষার্থীদের সাথে কারও বাবা আসছে, কারও মা আসছে কারও বা অন্য কেউ আসছে। অন্যদের অভিভাবকদের দেখে মনটায় কেমন যেন চিনচিন করে উঠলো। আজ যদি আমার বাবা সুস্থ থাকত তাহলে হয়ত বা আমার বাবাও এদের মধ্যে থাকত। যাইহোক, পরীক্ষা দিয়ে বের হচ্ছি, সবার অভিভাবক হামাগুড়ি দিয়ে সবার কাছে ছুটে আসছে । বলছে পরীক্ষা কেমন হয়েছে,কয়টা দাগিয়েছো,  চান্স হবে তো ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন। মনে পরে গেল বাবার কথা। বাবাও ঠিক এমন করে আমার কাছে উড়ে উড়ে আসত। মনে যদি শান্তি না থাকে চান্স হবে কেমনে। তিন দিন পরে রেজাল্ট দিল চান্স হল না।

এই জীবনের প্রথমবার পরীক্ষায় ফেইল করলাম। ধৈর্যহারা হলাম না। আরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরম তোলা আছে। পরীক্ষা দিয়েই যাচ্ছি দিয়েই যাচ্ছি। কেমন যেন একটা হতাশা কাজ করছে মনের মধ্যে। নিজেকে ব্যর্থ ছাত্র বলে মনে হচ্ছে। আশা একদমই ছেড়ে দিলাম। আমাকে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হবে না।

পড়াশোনা এক পর্যায়ে বিরতির পথে। হঠাৎ একদিন ঐ চট্টগ্রামের বড় ভাই ফোন দিলেন। আমার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমার কোথাও চান্স হল কি না। আমি ম্যান ম্যানিয়ে বললাম না ভাই কোথাও চান্স হল না। ভাই আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, আর কোথাও ফরম-টরম তোলা আছে কি? আমি বললাম,একটা তোলা আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। উনি বললেন, শেষ ভরসা হিসেবে সময়টা কাজে লাগাতে পার।

ভাইয়ের কথায় মনটা এক সাগর পরিমান সাহস জোগাড় করে ফেলল। ইসলামী বিশ্ববিদ্যলয়ে পরীক্ষা দিলাম,মেধা তালিকায় চান্স হয়ে গেল। এমন সময় বাড়ি থেকে ফোন আসে। আমি বাড়ির বাইরে, বাড়ি থেকে অনেকটাই দুরে। ফোন রিসিভ করলাম। ওপাস থেকে বলল, রাজন তুমি কোথায়? আমি বুঝতে পারলাম, বাবার অবস্থা সম্ভবত ভাল না। ছুটে গেলাম বাড়ি। দেখি বাবাকে কালেমা পড়ানো হচ্ছে । সবাই বলছে রাজন তোমার বাবা আর হয়ত বা বেশি সময় পৃথিবীতে থাকবে না। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম এ কথা আর বলা হল না। কাকে বলব! বলার মানুষটি ই তো মাটিতে শুয়ে আছে। যাকে কথা দিয়েছিলাম সেই তো আজ অমলিন।

বাবাকে কথা দিয়েছিলাম যে তুমি হবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া ছেলের পিতা। আজ আমি তা পেরেছি। কিন্তু যার জন্যে এত কিছু সে তো বুঝবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। একটি বারের জন্যেও বাবার কানে পৌছাতে পারলাম না যে, বাবা তোমার ছেলে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। অনেকদিন হল বাড়ি যাওয়া হয় না। ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমিস্টার পরীক্ষা রমজান মাসে নিবে। সেই যে ভর্তি হয়েছিলাম আর বাড়ি যাওয়া হয় নি। বাবাকে অনেক দিন হল দেখি না। জানি না কেমন আছে সেই মানুষটি। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। ঈদের আগেই শেষ, শুধু ভাইভা টা বাকি ছিল।

অনেক দিন পর বাড়ির পথে মুখ করলাম। বাড়ি এসে শুনলাম বাবার অবস্থা খুব একটা আসঙ্কাজনক নয়। বিপদ রেখা যেন হাতছানি দিয়ে বার বার তাকে মৃত্যুর দেশে ডাকছে। আমি কোনো সারা শব্দ না করে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। কানে কানে বললাম,বাবা এখন কেমন লাগছে তোমার? বাবা শুধু আমার দিকে চেয়ে আমায় দেখে একটু ঘুরে শুইলেন। বাবার হাতটা আমার মাথায় দিয়ে কিছু বলার চেষ্ট করছিলেন। কিছু বলতে না পেরে দুচোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ছেড়ে দিলেন। আর হাতটা বার বার নাড়াচ্ছে। মনের মধ্যে না জানি কত কথা জমে আছে তার। কত কথাই যে তিনি বলতে চাচ্ছেন কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাকে বলতে দিচ্ছে না।

আমি মাকে ডেকে বললাম, মা বড় ভাই-আপু আর ভাবি ওরা কেউ বাবাকে দেখতে আসেনি? মা তখন মনটায় এত পরিমাণ ছোট করেছিলেন যেন আমি তার বুকে আস্ত একটা কুড়াল দিয়ে কোপ মেরেছি! মা একটু রাগান্বিত হয়ে বলল, ওরা আসবে কেন? ওদের কিসের দরকার পরেছে দুর থেকে এসে হাজার টাকা খরচ করে এই অকর্ম দেখবে। তাই আসেনি তারা।

মায়ের অভিমানের এক একটি কথা যেন এক একটি কথা নয় হাজারটা বুলেট। আমার বুকটা ঝাঝরা হয়ে গেল। একটি সন্তানকে মা তখনই এ কথা বলতে পারে যখন সন্তান তার বাবাকে অবহেলা করে। ঠিক তেমনটাই রাজনের বড় ভাইদের বেলায়ও সম্ভবত তাই হয়েছে।

মা আমাকে বলেছিলেন,রাজনের বড়বোনের স্বামী বড় ধরনের ব্যবসায়ী। তার অনেক টাকা আছে। বাবাকে চিকিৎসা করাতে তিনি নিজের টাকাতে ই করতে পারবেন। কিন্তু শুনেছি তিনি একটিবারের জন্যেও বাবাকে দেখতে আসেনি। দেখা তো দুরের কথা, তিনি তার শ্বশুরকে আজ পর্যন্ত দেখেন ই নি। একটা জামাই তার শ্বশুরের কাছে অপরিচিত বিষয়টা অবাস্তব হলেও আমাদের বেলায় তা বাস্তবে রূপ ধারন করেছে। সেইজন্যেই হয়ত আজ আমাদের এ দূর্বিসহ অবস্থা।

আর আমার বড় ভাইদের চেহারা আমার ভাল মনে নেই। কত দিন আগে যে দেখেছিলাম তাও খেয়াল নেই। বড় ভাই এলাকার বড় ব্যবসায়ি, মেজো ভাই ঢাকায় একটি কোম্পানীতে চাকরি করে। তাদের অনেক আছে কিন্তু বাবাকে দেয় না। আমার কিছুই নেই আজ। বাবা মাঝে মাঝে আমাকে বলতেন যার আছে তার আছে, যার নেই তার নেই। কথাটা আজ বাস্তবে উপলব্ধি করতে পারছি।

বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে যেতে হবে। গিয়েই ভাইভা তে উপস্থিত হতে হবে। ভাইভা মোটামুটি ভালই দিলাম, জীবনের প্রথম ভাইভা ছিল এটা। তারপর ক্লাস শুরু হয়ে গেল ২য় সেমিস্টারের।

২ মাস পর বাড়ি থেকে ফোন, হ্যালো, কে? কে হতে পারি আমি? পুরুষ কণ্ঠ অনেক পূরনো বলে মনে হচ্ছে। হঠাৎ বলে উঠলাম, কে বাবা? হ্যাঁ চিনতে পেরেছিস তাহলে। বাবা আমি কি সত্যিই তোমার সাথে কথা বলছি! নয়তো কি রে বোকা আমি এখন আগের চেয়ে অনেক সুখি। বাবার মুখে সুখি কথাটা শুনে আমার যে কি ভাল লগছে মনে হচ্ছে এ যেন আমার স্বর্গের সুখ। অনেকক্ষণ কথা বললাম বাবার সাথে। অনেকদিন পর বাবার সাথে কথা, ফোনটা যেন কাটতে ইচ্ছা করতেছিল না।

বাবা তখন বলল, বাবা রাজন আমার ক্ষুধা লাগছে এখন খাব। তুমি ফোনটা রাখ। বাবার ক্ষুধা লাগছে খাবে আর আমি কথা বলেই যাচ্ছি তা হয় না। তাই ফোনটা কেটে দিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে গেলাম পরের দিন। সবাই বলাবলি করছে আজ নাকি রেজাল্ট দেবে। রেজাল্ট শোনার আগ্রহটা খুব বেশি আমার। কারন বিশ্ববিদ্যালয জীবনের প্রথম রেজাল্ট আজ। দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে তবুও রেজাল্ট দিচ্ছে না। দেহের মধ্যে কেমন যেন একটা টানাপোরা শুরু হয়ে গেল। রাত আটটার সময় হঠাৎ গ্রুপে পোস্ট, রেজাল্ট দিয়েছে।

আমার রোলটা একটু দুরে। তাই খুঁজে বের করে দেখতে একটু সময় লেগে গেল। আরে! একি অবস্থা। নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পারছিনা। আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছি না। খবরটা বাবার কাছে এখনই দেই। বাবা না জানি কত্ত খুশি হবে ভাবতেই আমার গায়ে বৈশাখি হাওয়া দোলা দিচ্ছে।

বাবার ফোন নাম্বারে ফোন দিলাম। রিসিভ করল না। আবার ফোন দিলাম তবুও ধরল না। তিন বার ফোন দিলাম ধরল না। কেমন যেন একটু রাগ হল আমার। এত সুন্দর একটা খুশির খবর বলব কিন্তু ফোনটা ধরছে না। আরও একবার ফোন দিলাম। এবার রিসিভ করল। খুশির এক প্রান্তে মনটা ফুরফুরা করে বললাম, হ্যালো… ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ আসল না। ভাবলাম হয়ত বা আমার কথা শুনতে পায় নি। আবার বললাম, হ্যালো…. ওপাশ থেকে একটি আওয়াজ এসেই ফোনটা কেটে গেল। আওয়াজটা ছিল, তোমার বাবা এইমাত্র মারা গেছে!

মোঃ মেহেদী হাসান
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন