রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
যেভাবে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে, আদালতের জবানবন্দিতে খুনিরা
অক্টোবর ১৪, ২০১৯
যেভাবে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে, আদালতের জবানবন্দিতে খুনিরা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নৃশংস ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ১৫ জন রয়েছেন। পুলিশের তদন্তে নাম আসায় বাকি চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এসেছে যে,তাঁরা শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে মারধর করছিলেন এবং একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আবরারকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করা হয়েছে,নাকি মারধরের জন্য মারধর করা হয়েছে, সে ব্যাপারে এখনও পরিস্কার কিছু জানাতে পারেনি কোনো সংবাদ মাধ্যম।

আবরার বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন। তিনি থাকতেন বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে। ৬ অক্টোবর একই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে তাঁকে নির্যাতন করেন হত্যা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে ক্রিকেটের স্টাম্প আর প্লাস্টিকের মোটা দড়ি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে মাটি থেকে তুলে আবারও পেটাতে থাকেন তাঁরা। ঘণ্টা কয়েক পর বমি করতে শুরু করেন আবরার। তিন চার বার বমি করার পর নিস্তেজ হয়ে যান আবরার।

এভাবেই আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সমাজসেবা বিষয়ক উপ-সম্পাদক ইফতি মোশাররফ ওরফে সকাল। তাঁর কক্ষেই ৬ অক্টোবর রাতে শিবিরকর্মী সন্দেহে পেটানো হয় ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদে ইফতি বলেছেন, ৪ অক্টোবর বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে ‘আবরার শিবির করে,তাকে ধরতে হবে’ বলে একটি নির্দেশনা দেন।

ইফতি আদালতে বলেন,৬ অক্টোবর রাত আটটার কিছু পর আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। আবরারের দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও সঙ্গে আনা হয়। তাঁর রুমমেট বুয়েট ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ একটি মোবাইল ফোন এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আরেকটি মোবাইল ফোন চেক করেন। একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মুনতাসির আল জেমি আবরারের কাছ থেকে তাঁর ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড নিয়ে খুলে চেক করেন।

এভাবে আবরারের ডিভাইসগুলো তাঁরা যখন চেক করছিলেন, তখন মেহেদী হাসান এবং বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মো. মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়ন কক্ষে আসেন। তখন মেহেদী তাঁদের বুয়েটে কারা কারা শিবির করে তা আবরারের কাছ থেকে বের করার জন্য নির্দেশ দেন। এ সময় মেহেদী বেশ কয়েকটি চড় মারেন আবরারকে।

এসময় বাইরে থেকে কেউ একজন স্টাম্প নিয়ে আসেন। তারপর সামসুল আরেফিন ওরফে রাফাত স্টাম্প এনে তাঁর হাতে দেন। আবরারের কাছ থেকে কথা বের করার জন্য স্টাম্প দিয়ে  আঘাত শুরু করেন ইফতি। এতে স্টাম্পটি ভেঙে যায়। পরে অনিক সরকার স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু, পা, পায়ের তালু ও বাহুতে মারতে থাকেন তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক। এতে আবরার উল্টাপাল্টা কিছু নাম বলতে শুরু করেন। তখন মেফতাহুল আবরারকে চড় মারেন এবং স্টাম্প দিয়ে হাঁটুতে বাড়ি দেন। তখন মেহেদী মুঠোফোনে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ইফতি আদালতকে বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ক্যানটিনে খেতে যান। কিছু সময় পর ফিরে এসে দেখেন,আবরার অসুস্থ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন। তিনি তখন আবার আবরারকে ধমক দিয়ে উঠে দাঁড় করান। কয়েকটি চড় এবং মুজাহিদুর রহমানও তখন কক্ষে থাকা স্কিপিং রোপ দিয়ে আবরারকে মারেন। ইফতি আবার স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু ও পায়ে আঘাত করা শুরু করেন একইসাথে তাবাখখারুলও তখন চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন।

পরে রাত ১১টার দিকে অনিক সরকার আবার কক্ষে এসে তথ্যর কোন হদিস না পেলে স্টাম্প দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করেন। অনিককে এভাবে খুবই অনিয়ন্ত্রিতভাবে মারতে দেখে অন্য সবাই ভয় পেয়ে যান। এরকম ঘন্টা খানেক মারার পর আনুমানিক রাত ১২টার সময় অনিক আবরারকে মারা থামিয়ে কক্ষের বাইরে যান।

ইফতি বলেছেন,তখন আবরার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন,তাঁর প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে এবং কিছুক্ষণন পরই আবরার বমি করা শুরু করেন। মুঠোফোনে বিষয়টি অনিককে জানানো হলে তিনি আবরারকে গোসল করিয়ে হাতে-পায়ে মলম লাগিয়ে দিতে বলেন। তখন আবরারের কক্ষ থেকে একজন তাঁর কাপড়চোপড় নিয়ে আসে। এই ঘটনা দেখে মেহেদী আবরারকে বলেন, ‘ও নাটক করছে’!

ইফতি বলেন,এরপর আবরারকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয়। এ সময় অমিত খুদে বার্তা পাঠালে তিনি সবকিছু জানতে চান এবং আবরারকে আরও মেরে আরও তথ্য বের করতে বলেন। আবরারের অবস্থা খুব খারাপ জানালে অমিত তাঁকে হল থেকে বের করে দিতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর মেহেদী ও অনিক ২০০৫ নম্বর কক্ষে আসেন। এ সময়ও আবরার আবার বমি করেন। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেওয়ার জন্য নিচে নামাতে বলেন। ১৭ ব্যাচের ছেলেরা আবরারকে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হলে তোশকসহ আবরারকে ধরে দোতলা ও নিচতলার সিঁড়িতে নামিয়ে রাখেন। তখন আবরার প্রায় অচেতন হয়ে পড়েন। এ সময় মুনতাসির দৌড়ে এসে বলেন, আবরারের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ইফতি তাঁকে মালিশ করতে বলেন এবং ইসমাইল ও মনিরকে তখন অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দিতে বলেন।  অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হওয়ায় তামিম বাইক নিয়ে বুয়েট মেডিকেলের চিকিৎসক নিয়ে আসেন। চিকিৎসক সিঁড়িতেই আবরারকে দেখে বলেন,ও মারা গেছে। ইফতি এই শুনে দ্রুত একটি কক্ষে গিয়ে শুয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তার রুম থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং শুরু হয় গ্রেপ্তার অভিযান। তারপর থেকে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email