মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৪ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
রাংকিং এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা
জুন ১০, ২০২০,  ১০:১২ অপরাহ্ণ
রাংকিং এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা

পুরো পৃথিবী জুড়ে রয়েছে কয়েক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান এবং সভ্যতার বিকাশের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক অনেক প্রাচীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের মধ্যেই আছে তার পরিচয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একটি দেশের দর্পন। যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যত ভালো, সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তত ভালো।

আজকের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অগ্রগতি পরিমাপের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত মাপকাঠি হলো রাংকিং। পৃথিবীর জুড়ে অনেক রকমের রাংকিং থাকলেও মূলত দুটি রাংকিং পদ্ধতিটিকে এই ক্ষেত্রে সুপরিচিত হিসেবে ধরা হয়ে থাকে – QS Top Universities এবং Times Higher Education World University Rankings। রাংকিংগুলোর নামের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও মোটামুটি সব রাংকিং পদ্ধতিতে বেশকিছু বিষয়ের উপর নজর দেয়া হয়ে থাকে যেমন – একাডেমিক রেপুটেশন, টিচিং (লার্নিং এনভায়রনমেন্ট), রিসার্চ (কোয়ালিটি এবং রেপুটেশন), সাইটেশনস, গ্রাডুয়েটদের রেপুটেশন, কোয়ালিটি অফ এডুকেশন, ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক, ফ্যাকাল্টি-স্টুডেন্ট রেশিও, ইন্ডাস্ট্রি ইনকাম ইত্যাদি। বিগত বছরগুলোতে এবং স্বাভাবিকভাবে এই বছরও আমরা দেখেছি যে আমাদের দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়তো এই রাংকিং এ নেই আবার যাদের আমরা খুব বড় করে দেখি তাদের অবস্থানও নড়বড়ে এই আন্তর্জার্তিক রাংকিংগুলোতে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার কি পরিমান বেহাল তা মোটামুটি এই রাংকিংগুলো থেকে অনেকটাই জানা যায়। দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে রাংকিং হচ্ছে প্রতিবছর এবং রাংকিং হবার পর বেশ কিছু হাস্যকর বক্তব্য আমরা শুনতে পাই যেমন আমরা এগিয়েছি, আমরা টাকা দিলে রাংকিং হতো – এই রকম আরো কত কি। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থা একদিনে হয় নি। যে বিশ্ববিদ্যালয় হবার কথা ছিল বিদ্যার মন্দির, গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু তাকে আমরা বানিয়ে ফেলেছি সন্ত্রাসের ডেরা, রাজনৈতিক হানাহানির কেন্দ্রবিন্দু। একটি আন্তর্জার্তিক রাংকিংয়ে আসার জন্য যে জিনিসগুলো প্রয়োজন তার কোনোটিই ঠিক করে আমাদের
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই। একটি গভীরভাবে চিন্তা করলেই এর সত্যতা মিলে- একটি আন্তর্জার্তিক রাংকিংয়ে আসার জন্য যে জিনিসগুলো প্রয়োজন তার কোনোটিই ঠিক করে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই। একটি গভীরভাবে চিন্তা করলেই এর সত্যতা মিলে-

১। একাডেমিক রেপুটেশন : একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেপুটেশন অনেক কিছু দিয়ে হতে পারে। তবে প্রথমেই রেপুটেশন তৈরী হয় পড়াশোনার পরিবেশ এবং মান দিয়ে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিন্তু অনুকূল পরিবেশও নেই, আবার ভালো পলিসিও নেই যাতে করে একাডেমিক রেপুটেশন আরো বৃদ্ধি করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হবে, নতুন আবিষ্কার হবে, নতুন কিছু জয় করা হবে। এই বিষয়গুলো আমাদের দেশে বরাবরই অবহেলিত। জাতিগতভাবে আমরা ইনোভেশনকে অন্য পথে ব্যবহার করেছি এবং আজও করছি। আমাদের পাশের অনেক দেশি আজ উন্নতির অনেক উপরে চলে গিয়েছে এবং আন্তর্জার্তিকভাবে তাদের রেপুটেশন সৃষ্টি করতে পেরেছে।

২। গ্রাডুয়েটদের রেপুটেশন : অপ্রিয় হলেও সত্য হচ্ছে আমাদের দেশের হাতেগোনা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাডুয়েটদের রেপুটেশন রয়েছে। কিন্তু সেই রেপুটেশনটি মূলত লোকাল রেপুটেশন আবার আজকাল বিসিএস কালচারের চাপে এই রেপুটেশনটিও মৃতপ্রায়। একাডেমিক রেপুটেশন, লার্নিং এনভায়রনমেন্ট এবং গ্রাডুয়েটদের রেপুটেশন এরা একে ওপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না। একাডেমিক রেপুটেশন সেই রকম বিশ্বমানের হলে গ্রাডুয়েটদের দেশের চাকরির উপর নির্ভর করতে হবে না, দেশের বাইরেও তাদের জন্য সুযোগ থাকবে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের পাশের দেশ ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মানাজেমেন্টের কথা বলা যেতে পারে। অনেকেই হয়ত জানেন না যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট থেকে পাস করার আগেই লাস্ট সেমিস্টারেই চাকরি হয়ে যায় তাও আবার বিশ্বের বড় বড় নামকরা কোম্পানিগুলোতে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মানাজেমেন্টগুলো নিজেদের একাডেমিক রেপুটেশন সেইরকমভাবে তৈরী করেছেন বলেই আজ তারা এই বিষয়টি চিন্তা করতে পেরেছে।
অথচ ক্যাম্পাস প্লেসমেন্ট নামক জিনিসটি আমাদের দেশে কাগজে কলমে থাকলেও তার পূর্ণ রূপ পায় নি।

৩। কোয়ালিটি অফ এডুকেশন : আসলে আমাদের দুঃখের এবং কষ্টের শেষ নেই। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পারফর্মার নিয়োগ দেয়া হয় না, ফলোয়ার নিয়োগ দেয়া হয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাবেদারী সিস্টেম চলে, স্বাধীন চিন্তাধারা এখানে অঘোষিত পাপ। ভালো শিক্ষকের অভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান একদম মার্জিনাল লেভেলে চলে গিয়েছে আজ। এখন সিজিপিএ থাকলেও প্রকৃত জ্ঞান নেই। বিশেষ করে দেশের বাইরে যারা পড়াশোনা করতে যান, তাদের অনেকেই বুঝতে পারেন যে দেশের পড়াশোনাতে কি রকম দায়সারা উপায়ে পড়ানো হয়েছিল। অনেকেই আছেন যারা ঠিক মতো ক্লাসে কি করে পড়াতে হয় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা জানেন না। ফলে মাল্টিমিডিয়ার মতো একটি বিশ্বসেরা পড়াশোনার মাধ্যম আমাদের কাছে নিরস হয়ে পড়েছে।

৪। রিসার্চ আউটপুট, রেপুটেশন এবং সাইটেশন: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গান-বাজনা, মিছিল -মিটিং, নির্বাচন সবই হয় কিন্তু গবেষণার বেলায় সব শুন্য। ভালো শিক্ষক মাত্রই একজন ভালো গবেষক। রাংকিংয়ে ভালো করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা হয় প্রচুর, আবার পড়াশোনাও হয় ভালো। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রমোশনে গবেষণাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদের আজও কি অদ্ভুত পদ্ধতি যে পিএইচডি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়। শিক্ষকগণ পিএইচডি করা হতে হবে এবং অবশ্যই তাদের প্রতিবছর আন্তর্জার্তিক জার্নালে পেপার পাবলিশ করা লাগবে। আবার যেনতেন গবেষণা নয়, সেই গবেষণা হতে হবে ভালো এবং সেই গবেষণার পক্ষে সাইটেশনও হতে হবে। এই রকম নিয়ম করে দিলে প্রকৃত মেধাবীগণ শিক্ষক হবে রাজনৈতিক এজেন্ট এবং ফায়দাবাজগুলো এই দৌড়ে আসবে না কোনোদিন।

৫। ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক: বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করবে এমন নয়। বাইরে থেকেও ছাত্র-ছাত্রীরা আসবে এতে করে দেশের সুনাম হবে। দেশের এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা সবাই জানবে। এই জানার ক্ষেত্রে সবচাইতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবপেজ। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবপেজ দেখলে মনে হয় দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও তথ্য ভালো করে দেয়া নেই। বিশ্ববিদ্যালয়দের শিক্ষকগণের প্রোফাইল ভালো করে আপডেট দেয়া নেই। অনেক লিংক আবার কাজ করে না ঠিক মতো। অবাক হলেও সত্যি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী এবং অনেক শিক্ষকের কোনো অফিসিয়াল ইমেইল ঠিকানা নেই। ইন্টারন্যাশনাল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমান সাপোর্ট নেই। আরো নানা সমস্যা। এত সমস্যা নিয়ে রাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে থাকার থাকার চিন্তা করা বোকামি হবে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যায়গুলো নিয়ে তেমন পসিটিভ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। অনেকেই মনে করে বড় বড় দালান নির্মাণ করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি হয়। আসলে এটা যারা মনে করেন তারা প্রাগৈতিহাসিক যুগে পরে আছেন। জাতির দর্পন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় খেলাধুলা কিংবা রাজনীতি নয়। তাই আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত করতে হবে।

পরিত্রানের উপায় :
এখন প্রশ্ন হতে পারে এরকম অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় কি ? অনেক কিছুই করা যেতে পারে। সম্ভাব্য কাজগুলো হতে পারে –
♦ পরিকল্পনা করতে হবে, উপরের দুর্বল দিকগুলোর উপর কাজ করে সেইগুলোতে শক্তিশালী দিকে পরিণত করতে হবে।
♦ তাহলেই আমরা আমাদের দেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে পাবো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাংকিংয়ে।
♦ দেশের মেধাবী সন্তান যারা দেশের বাইরে আছেন তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তাদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালনার বার ন্যাস্ত করতে হবে।।
♦ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে।
♦ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল পড়াশোনা এবং গবেষণা নিয়ে কথা হবে।
♦ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে চাকরির পড়াশোনা ব্যান করে দিতে হবে।
♦ একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনোকালেই চাকরির পড়াশোনার কেন্দ্র থাকে নি কিন্তু আমাদের দেশে আমরা তাই করেছি। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এবং তার কার্যক্রমের পুরোপুরি পরিপন্থী।
♦ ক্যারিয়ার প্লেসমেন্ট অফিসকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিষয় চালু করতে হবে পুরোনো বিষয়গুলোকে মার্জ করতে হবে কিংবা উঠিয়ে নিতে হবে।

তাহলেই কেবল রাংকিং নামের সোনার হরিণকে ধরা যাবে।

 

 লেখক, নূর আল আহাদ
বিবিএ (ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা, বাংলাদেশ)
এমবিএ (ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া, মালয়েশিয়া)
মাস্টার অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, জাপান)
ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক (জাপান)

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন