বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়‌
জুন ২৮, ২০২০,  ১০:১২ অপরাহ্ণ
শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়‌

শতবর্ষে পদার্পণ করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
একটি জনগোষ্ঠীর প্রাচীন,ঐতিহ্যবাহী ও প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কেন্দ্র হিসাবে গত একশত বছরে এই প্রতিষ্ঠানটির অর্জন-বিসর্জনের তালিকা বেশ দীর্ঘ।অবিভক্ত ভারতে পূর্ববঙ্গের মানুষ ছিল সুবিধা বঞ্চিত। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের কারণে পূর্ববঙ্গের মানুষের মনে আশার সূর্য উদিত হলেও সে সূর্য অস্তমিত হতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর বঙ্গের মুসলিম সমাজ যখন পুরোপুরি আশাহত; ঠিক সেই সময় তাদের পূর্ব আবেদনকে আমলে নিয়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই বছরই ২৭ই মে রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণাটি কার মস্তিষ্কপ্রসূত, কার দাবি সরকারকে বেশি প্রভাবিত করেছিল, এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। অনেক গবেষকই মুসলিম নেতাদের এই কৃতিত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ড. সুফিয়া আহমেদ দাবি করেছেন, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০৫ সাল থেকেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন। ড. আবদুর রহিম বলেছেন, মুসলিম প্রতিনিধিদল হার্ডিঞ্জের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানিয়েছিল। কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করে তথ্য প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন নবাব সলিমুল্লাহ এবং নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী লর্ড হার্ডিঞ্জের ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।’মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স’-এর অনারারি জয়েন্ট সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সাহেবজাদা আফতাব আহমেদ খাঁ। ১৯০৬ সালের ২৭-২৯ই ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের বিশতম অধিবেশনে তিনি প্রথম ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। চার বছর পর ১৯১০ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক পরিষদে পরিষদ সদস্য বাবু অনঙ্গ মোহন সাহা ঢাকায় একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি হাইকোর্ট স্থাপনের দাবি তোলেন। ১৯১১ সালের ১৯ই আগস্ট ‘পূর্ববঙ্গ-আসাম প্রাদেশিক মুসলমান সমিতি’ ও ‘প্রাদেশিক মুসলিম লীগ’ লেফটেন্যান্ট গভর্নর হেয়ারকে বিদায় ও নতুন লেফটেন্যান্ট গভর্নর সি বেইলিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানায়।

১৯১২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি ঘোষণা আসে। তখন অনেকেই এর বিরোধিতা শুরু করেন। প্রধানত উচ্চবর্ণের হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও উকিল শ্রেণিরা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না । ১৬ই ফেব্রুয়ারি স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করে এই উদ্যোগকে ‘অভ্যন্তরীণ বঙ্গ-বিভাগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিরোধিতা করেন। বিরোধিতাকারী অন্যান্য জাতীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন বিপিন চন্দ্র পাল, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, সুরেন্দ্রনাথ সমাজপতি, ব্যারিস্টার ব্যোমকেশ চক্রবর্তী, পেয়ারী মোহন মুখোপাধ্যায়, অম্বিকা চরণ মজুমদার। ঢাকার হিন্দু নেতাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী আইনজীবী ও সাবেক পৌরসভা চেয়ারম্যান আনন্দচন্দ্র রায়, বাবু ত্রৈলোক্যনাথ বসু প্রমুখ। বিরোধিতাকারী কংগ্রেসপন্থী মুসলমান নেতাদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, মাওলানা আকরম খাঁ, মৌলবি আবুল কাসেম, বিহারের মৌলবি লিয়াকত হোসেন।

১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর বিরোধিতা যেমন ছিল, তেমনি তা বাস্তবে রূপদানের জন্য অনেকে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এবং নবাব নওয়াব আলী। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর(১৯১৪) নবাব নওয়াব আলী একাই বিভিন্ন সভা সমাবেশে দাবি-দাওয়া পেশ সহ অসাধারণ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
এ ছাড়া আরও যেসব নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন নবাব সিরাজুল ইসলাম, স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা, আবদুল করিম, এ কে ফজলুল হক, আহছানউল্লাহ প্রমুখ। এভাবেই বিভিন্ন প্রতিকূলতা ছাপিয়ে ১৯২১ সালের ১লা জুলাই আত্মপ্রকাশ করে আজকের শতবর্ষে পদার্পণ করা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।প্রতিষ্ঠার পঁচিশ বছরের মধ্যেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ এর মতো সংকটের মধ্যে পরে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
এর ফলে মানের কিছুটা অবনতি ঘটলেও চল্লিশ বছরের মধ্যে এশিয়ার অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর সারিতে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অর্জন আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে প্রত্যেকটা আন্দোলনের প্রাণভোমরা হিসাবে কাজ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফার সমর্থনে ছাত্রসমাজ কর্তৃক ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, সবশেষে ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ সহ প্রতিটা জাতীয় আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।আর সে কারণেই পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পরিণত হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। ২৫শে মার্চের হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো। জাতিকে মেধা শূন্য করার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর হত্যা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রবীণ এবং বুদ্ধিজীবী শিক্ষককে।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য ছাড়া বলবার মত তেমন কিছুই নেই। ছাত্ররাজনীতির অপচর্চা, গবেষণা বিমুখ শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষার্থী বান্ধব পরিবেশের অভাব প্রভৃতি কারণে মলিন হয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ব্যর্থতা। প্রযুক্তির যুগে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চাৎপদ। অনলাইন ভর্তি পরীক্ষা, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল জার্নাল, রেফারেন্স তথ্যভান্ডার ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তার ব্যবহার সন্তোষজনক নয়। অপরদিকে গবেষণা খাতে প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাব, গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশের অভাব এবং ছাত্র-শিক্ষকদের গবেষণায় অনীহা প্রভৃতি কারণে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ক্রমে অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে । উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রূপকল্প নির্ধারণ করা। এ রকম লক্ষ্য না থাকায় বিশ্বব্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে নেওয়া প্রকল্পগুলো বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অবস্থানের উন্নতি করতে প্রায় কোনো লক্ষণীয় প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে ছাত্র রাজনীতির অপচর্চা বন্ধ করে,ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র প্রতিনিধিদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া পূরণ এবং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের এই ভবিষ্যৎ বাণী কিছুটা হলেও বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। দীর্ঘ ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙ্গে ২০১৯ সালের ১১ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ(ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ডাকসু নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় গত ১ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত,প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন সংকটের নিরসন ঘটেছে। ডাকসুকে নিয়ে ইতোমধ্যে আশাবাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অতীত ঐতিহ্যকে সামনে রেখে শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের যাবতীয় ব্যর্থতা, গ্লানি ঝেড়ে ফেলে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

সাগর আহমেদ
বাংলা বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন