সোমবার, ৬ই জুলাই ২০২০ ইং, ২২শে আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
শান্তির নীড়
নভেম্বর ৯, ২০১৯
শান্তির নীড়

ক্রিং ক্রিং করে বেজেই চলছে আমেনা বেগমের ফোন। তবে আজ কেন জানি সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তাঁর! অনাবরত আলাপচারিতা করেই যাচ্ছে করেই যাচ্ছে। থামবার মতো কোন লক্ষণও পরিলক্ষিত করা যাচ্ছে না! আর সাধ্যমতো হু হা করে সব কথার সাড়া দিচ্ছেন পাশের বাড়ির আলেয়া বেগম ।

আক্ষেপের ছলে আমেনা বেগম বলতেছে,বুঝেছেন ভাবি! এই তো কয়েক দিন হলো, তাতেই আমার ছেলেটার মাথাটা একেবারে খেয়েই ফেলেছে। ছেলেটা কেন জানি এখন সবার থেকে বউয়ের কথাই প্রাধান্য দেয়! আর ঘর থেকেও কেন জানি বের হতেই চায় না!
আর বউটাও মনে হয় তাকে, তার হাতের মুঠোয় রাখার চেষ্টা করতেছে। আল্লাই জানে,আমার ছেলেটার যে কি অবস্থা হবে। ভাল্লাগেনা এসব আদিখ্যেতা!

আলেয়া বেগম কিছু বলবে বলবে ভাবতেছে কিন্তু হঠাৎ করে আমেনা বেগম ফোন বাজার শব্দ শুনে, রুমে চলে যায় এবং যেয়ে দেখেন তার সদ্যবিবাহিতা মেয়েটি ফোন করেছে। ফোনের দিকে তাকিয়ে তিনি যেন কষ্টের সাগরে নিমজ্জিত হলেন। আর আফসোস করে বলতেছেন ইস! ময়নাটা আমার কখন থেকে যেন ফোন দিয়ে যাচ্ছে। আর আমি কিনা ফোন না ধরে আলাপচারিতা করে যাচ্ছি। অতপর ফোনটা রিসিভ করে বললেন, মা আমার, কেমন আছিস? জামাইবাবাজি ভালো আছে তো?

সকল কথা শেষ,এবার একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেছে
মারে, একটা কথা মনে রাখবি,জামাইবাবাজি যাতে কোন ক্রমে তোর কাছ থেকে হাতছাড়া না হয়, সে দিকটা একটু খেয়াল রাখবি। আর সব সময় তাকে নিজের আয়েত্বে রাখার চেষ্টা করবি। এ সব বলে তিনি তাঁর ফোনটক রেখে দিলেন।

আলেয়া বেগম এবার হতভম্ব হয়ে গেলো ।
এবার আর তিনি চুপ থাকতে পারলেন না। বললেন যে, এ কেমন কথা ভাবি! আপনি একটু আগেই বললেন, আপনার বৌমা না কি আপনার ছেলের মাথাটা খেয়ে ফেলেছে। আর এখন নিজের মেয়েকে বলে দিচ্ছেন যে, সে যেন আপনার জামাইবাবাজিকে হাতের মুঠোয় রাখতে পারে। তাহলে বিষয়টা কেমন হয়ে গেলো না!
আমেনা বেগম বললো, আরে ভাবি ও তো আমার মেয়ে আর এ তো অন্য ঘরের মেয়ে

এবার আলেয়া বেগম বললো ছি ছি ভাবি একটা বিষয় মনে রাখবেন, একটা মেয়ে ছোটবেলা থেকে একটা আলাদা পরিবেশে বেড়ে উঠে। তার হাশি-খুশি, রাগ-অভিমান, চাহিদা সবকিছুকে ফেলে এসে অজানা একটা জায়গায়, অচেনা একজনের সাথে, অপরিচিত একটা সম্পর্কের জোরে, জীবন অতিবাহিত করার লক্ষ্যে, ভালবাসার সব মানুষকে ফেলে, আপনাদের বাড়িতে এসেছে, যাতে করে দুনিয়ায় চলে আসা রীতিতে জীবনের বাকীটা পথ এখানে পারি দিতে পারে।
আর আপনি তাকে এই চোখে দেখতেছেন! তার ফেলে আসা অতীতকে নিয়ে একটুও কষ্ট হচ্ছে না আপনার!
আর আপনি কি যেন বলতেছেন আদিখ্যেতা! আপনি আদিখ্যেতার কি দেখেছেন, এটা তো তাদের অধিকার । তারা একে অপরের সাথে একটু সময় কাটিয়ে ভালবাসার বন্ধনটাকে আরো দৃঢ় করবে এটাই তো স্বভাবিক।
আর সব থেকে বড় কথা হলো আপনিও একজন মেয়ে এবং একজন মেয়ের মা, তাহলে আপনার কাছ থেকে কিভাবে এই একমুখী স্বভাবটা প্রকাশ হচ্ছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না!

এসব কথা একটু রাগান্বিত হয়ে বলেই, আলেয়া বেগম আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে বাড়ির দিকে হাটতে লাগলেন।

হুম এখনো আমাদের সমাজে আমেনা বেগমের মতো খারাপ মনোভাবের মানুষের অভাব নেই। তারা সব সময় নিজেদের নিয়ে চিন্তা করেন। নিজেকে মাধ্যম করে অন্যদেরকে বুঝতে, তারা কখনো চেষ্টা করেন না।
আর তাইতো তারা যখন নিজের মেয়েকে বিয়ে দিতে যায়, তখন সমাজের নাম করা বড় বড় আলেমদের কাছে যৌতুকের বিরুদ্ধে ফতোয়া নিতে যায়। আর ফতোয়া নিয়ে এসে সমাজে শক্ত অবস্থান নেয়।

আর বলে, নাহ! আমার মেয়েকে তো আর যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির মাধ্যমে কখনো বিয়ে দিতে পারি না। যার ফলে তারা যৌতুক ছাড়াই তার মেয়েকে বিয়ে দিতেও সক্ষম হয়।
কিন্তু ঠিক কয়েক বছর পর তাদের স্মৃতিপটে যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে দেয়া ফতোয়ার দৃশ্যটা ভেসে উঠে না। কারন এখন যে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছেলেটার বিয়ে। এখন তারা কি চাবে আর কি নিবে সেজন্য দুচোখের পাতা এক করতে পারে না।

আপনাদের বিবেক কি একটুও নাড়া দেয় না! আপনি যখন আপনার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন তখন আপনার অবস্থাটা কি হয়েছিল, আপনি কতটুকু পেরেশানিতে ছিলেন, তা কি একটি বারের জন্যেও আপনার মনে পড়ে না!
যদি মনে পড়ে থাকে তাহলে আপনি যাদেরকে আজ যৌতুকের জন্য চাপ দিচ্ছেন তাদের অবস্থা কেমন হবে একটু ভেবে দেখেছেন কি?

আবার সমাজের অনেক সচেতন মানুষকে দেখি, যাদের নিজের মেয়েরা, সামান্য একটু অসুস্থ হলে, চিন্তায় খানাপিনা ছেড়ে দেয়। কি করবে আর কি না করবে তা ভেবে কুল পায় না। কিন্তু মানুষের মেয়ে তথা তাদের বংশবিস্তারে যারা প্রানপন চেষ্টা করে এমন কি নিজের জীবনটাকেও বিলিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না, সে একটু অসুস্থ বোধ করলে বলে এগুলো সব ঢং বলে উড়িয়ে দেয়!

আসলে আমাদের বড্ড বুঝের অভাব। বুঝের অভাব না থাকলে আমি বা আপনি কখনো এ কথা বলতে পারতাম না। কারন আমি বা আপনিও তো আমাদের মেয়েদেরকেও কোথাও না কোথাও বিয়ে দিয়েছি। তাকে তো আর আমরা নিজের ঘরে বসিয়ে রাখি নাই । তাকে যদি কেউ এমন কথা বলে তখন আমাদের কেমন লাগবে? নিশ্চিত খুব কষ্ট পাবো ।
হুম এরকম সবারই কষ্ট লাগে। কিন্তু আমরা তখন ভিলেন থাকি তো, তাই তাদের কষ্টটাকে আমাদের কাছে কষ্ট মনে হয় না। ভুক্তভোগী হন, দেখবেন কষ্ট কাকে বলে!

তাই সমাজের লোকদের আবারো বলছি, নিজেদেরকে মাধ্যম করে মানুষকে মূল্যায়ন করতে শিখুন। দেখবেন পরিবারটা একেবারে শান্তির নীড়ে পরিণত হয়ে গেছে।

লেখক, মোঃ মিনহাজুল ইসলাম বকসী
শিক্ষার্থী,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া

Print Friendly, PDF & Email