মঙ্গলবার, ১লা ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
শিক্ষক দিবসে আমার কিছু গুরুদের কথা
জি কে সাদিক
অক্টোবর ৫, ২০২০,  ১০:২৯ অপরাহ্ণ
শিক্ষক দিবসে আমার কিছু গুরুদের কথা

আজকে ‘শিক্ষক দিবস’। সবাই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট করছেন। একটা পোস্ট করবো বলে আমার প্রিয় শিক্ষক খোঁজ ছিলাম। কিন্তু আমি যখন দেখলাম আমার শিক্ষকগণ এই মৃত্যু উপত্যকায়, ধর্ষণের উপত্যকায়, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের নিপীড়নের মধ্যে দাঁড়িয়েও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে তখন আমি তাদের একটুও ভালোবাসা, সম্মান কিম্বা শ্রদ্ধা নিবেন করতে পারছি না।

কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কবিতায় বলেছেন, ‘যে শিক্ষক, কবি ও কেরানি এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে আমি তাকে ঘৃণা করি।’ এটা আমার উপলব্ধিতে দারুণভাবে আঘাত করেছে। নবারুণ আমার প্রিয় কবিদের একজন। নবারুণ শিখিয়েছে কবিতা যেন মরতে ভয় না পায়। আমি এই শিক্ষা নিয়েছি। আমি শিক্ষক দিবসে যারা আমাকে পড়িয়েছেন বা পড়াতে চেষ্টা করেছেন তাদের সবাইকে শ্রদ্ধা জানাতে পারতাম। কিন্তু সেটা হতো আর্টিফিশিয়াল; মিথ্যা বলা। তাই আমি চাইনি মিথ্যা বলতে।

আমার খুব মনে আছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লোকমান (হিরা) স্যার, মিরাজ স্যার ও শাহীন স্যারের কথা। তাদের মুখ এখনও ভুলিনি। আমার মনে আছে হিরা স্যার আমাকে বলেছিলেন, ‘দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা, চুপিচুপি খাও তুমি চানাচুর ভাজা।’ স্যার আমাকে ভীষণ আদর করতেন। একদিন (৫ম শ্রেণি) আমি অপরাধ করেছিলাম, কিন্তু পিটুনি খেয়েছিল আমার পাশের দু’জন। স্যার জানতেন যে কাজটা আমার। ওদের পিটুনি দেয়ার পর বললেন, ‘এইবার রাজামশাইয়ের পালা।’ আমি তো ভয়ে শেষ, কিন্তু স্যার মারতে গিয়ে হেসে দিয়েছিলেন। তার মুখ এখনও মনে আছে।

৪র্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার মাথায় ঐকিক নিয়মের অংক কোনোভাবেই ঢুকছিল না। আমি না বুঝেও বলেছিলাম যে বুঝেছি। এজন্য হীরা স্যার ধরে বাটাম দিলেন এবং সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে একা সময় দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আর কখনও ভুলি নাই।

শাহীন স্যারের হাসি মাখা মুখ ভুলার নয়। মিরাজ স্যার ডাক দিয়ে বলতেন,’ জেষ্ঠা মশাই কী হাতের লেখা বাড়িতে লেখে আনছেন না কি ক্লাসেই কাম সারছেন।’ আমি বাড়ির কাজ সব সময় স্কুলেই সারতাম। স্যারের এই কথার পর আমি চুপ করে থাকতাম। তখন স্যার বলতেন, ‘আমার জেষ্ঠার মেলা বড় সংসার সামলায়ে সময় পায় না তাই ইশকুলেই কাম সারে।’ তিনি ইংরেজি পড়াতেন।

আমি ৪র্থ শ্রেণির বার্ষিক পরিক্ষায় চারুকলা পরিক্ষার দিন বাইরে খেলতে খেলতে পরিক্ষা দিতে পারি নাই। তখন এই তিনজন স্যার আমার রোল পিছিয়ে গেছে দেখে জরিমানা স্বরূপ তিনটা ঝাড়ুর দিতে বলেছিলেন। তার বদলে রোল নম্বর ঠিক রেখেছিলেন। এসবই আমার শিক্ষাজীবনের সেরা স্মৃতি। এছাড়া কিন্ডারগার্টেনেও আমার কয়েকজন প্রিয় শিক্ষক (ভাই) ছিলেন। যাদের আজও মনে আছে।

মাধ্যমিকে আমার দুজন শিক্ষককে কখনও ভুলবো না। একজন মোস্তফা কামাল (মোস্ত হুজুর) অন্যজন নূর মুহাম্মদ স্যার। দুজনেই গত হয়েছেন। মোস্ত হুজুরের কাছেই জীবনে সেরা কিছু পাঠ নিয়েছি। জীবনে নৈতিকতার প্রতি তিনি সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি গত হয়েছেন ২০১১ সালে। হার্টের বাল্ব নষ্ট হয়ে তিনি মারা যান। অসুস্থ হওয়ার পর হুজুরকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘সাদিক ব্রেইনটা দুষ্টামিতে কম খাটাবি। এই স্বাস্থ্য লয়া কাজ হবে না। তোর বাপের তো খাওনি সমস্যা নাই বেশি করে খাবি।’ আরও অনেক কথা। স্যারের এই দুটো কথা মনে আছে কারণ আমি এই দুটো কাজ করতে পারিনি।

নূর মুহাম্মদ স্যার আমার সব সময়ের শিক্ষক ছিলেন। স্কুল টাইম বাদে বিকেলে তার সাথে বসে থাকতাম। কী স্পৃহা ছিল জ্ঞানের প্রতি। আমার যে বই পড়ার অভ্যাস এটা তৈরিতে তার অবদানই সব চেয়ে বেশি। বিভিন্ন বিষয়ে ভারি বই ধরিয়ে দিয়ে বলতে এটা পড়বি৷ স্যারের কয়েকটা বই এখনও আমার কাছে আছে। সমাজে শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। সম্পর্কে আমরা দাদা-নাতিন। ৯ম ও ১০ শ্রেণিতে তিনি ইংরেজি পড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পাওয়ার জন্য ইংরেজির যে ব্যাসিক দরকার সেটা তিনি গড়ে দিয়েছিলেন। খুব কড়া মেজাজি ছিলেন, আবার তার সাথেই ক্লাসের বাইরে বিকেলে বা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে বেশি দুষ্টুমি করছি। ক্লাসে ভুল হলে অন্যদের দুটা মারলে আমাকে আর আমার সহপাঠী বন্ধু আলমকে ৪টা মারতেন। তিনি বলতেন, তোরা দুটা আমার নাতিন তাই তোদের বেশি মারি। মাঝে মধ্যে পিটুনি দিতে ভুলে গেলে আলাম ডেকে বলতেন স্যার আজকে আমারে আর সাদিকরে মারেন নাই। এই লোক ফিরে এসে পিটুনি দিয়ে যেতেন। এমনিই পিটুনি। উনিও ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পরলোকে চলে গেছেন।

বিকেলে স্যারে কাছে গেলে যেটা বেশি বলতেন, ‘শালা বই পড়বি, ভিতরে ক্ষুধা না থাকলে কিছুই পাইতি না।’ মানে গোপন কথা বা সত্য কিন্তু লুকিয়ে আছে এটা খুঁজে বের করার স্পৃহা আমি সব সময় তার মধ্যে দেখেছি। উনি সব চেয়ে শিখেয়েছেন কারো ক্ষতি করিস না। মাজলুম আর আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না। তার দোয়া আল্লাহ সরাসরি শুনে। মানুষের ক্ষতি করিস না।’ উনি ব্যক্তিজীবনে তিন-চারটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজের প্রচেষ্টায় গড়েছেন৷ এগুলোর সব কটাই আমার এলাকায় আলো ছড়াচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গুরু বা শিক্ষক বলে কাউকে কাউকে পেয়েছি। যাদের নাম আমি এখন লেখতে চাই না। যাদেরকে পেয়েছি তাদের রুমে গিয়ে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মন খুলে কথা বলেছি৷ নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছি। তবে সবটা না কিছুটা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটু সমস্যা থাকে।

আমার শিক্ষাজীবনে যা কিছু কল্যাণকর অর্জন সবই এই গুরুদের মঙ্গল কামনায় উৎসর্গ করছি। যারা আমাকে পড়তে শিখেছেনগুরুদের জানাই সালাম।’

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন