শনিবার, ১৬ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
শ্রাবণ মেঘের গল্প
এপ্রিল ২০, ২০১৯
শ্রাবণ মেঘের গল্প

নারিকেল ফুলে জমেছে শিশির। পুরোটা বদন মেখেছে ইচ্ছেমতো। আকাশে সেঁজে-কুঁজে বসে আছে মেঘেরা। সুযোগ পেলেই নামবে টিপটিপ। দখিনা জানালা খুলে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছি। কতনা ভাবনা এবেলায় বাসা বাঁধতে চায় এই কোমল হৃদয়ে। কিন্তু এতটুকু সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনা আমার। ইচ্ছে করেনা আর। স্কন্ধের মতো কত শত বেদনা নীরবে জ্বলে। এভাবেইএকসময় ক্লান্ত স্মৃতিগুলো ডুবে যাবে গভীর অতলে।

মাদরাসা ছুটি হলো শ্রাবণের এক বর্ষা দিনে। মাদরাসার পাশেই বাড়ি। তাই ছুটিতে তেমন তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। আম্মুকে বললাম, বেড়াতে যাবো। আম্মু কিছুক্ষণ চুপটি রইলেন। দৈবাৎ একটু নরম কন্ঠেই বললেন, যাও তোমার দাদুকে নিয়ে ছুটিটা কাটিয়ে এসো। আম্মুর কথা শুনে আমি তো আনন্দে আত্নহারা ! শহরের পাশেই ফুফীর বাড়ি। এর আগে কখন কবে গিয়েছিলাম ঠিকমনে নেই। প্রায় তিন-চার বছর পর কাল যাচ্ছি ফুফীর বাড়িতে….।

বিকেলটা গড়িয়ে সাঁঝ নামবে নামবে এমন সময়ই পৌঁছালাম অম্বিকাপুর। পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের বাড়িটা পার হয়ে একটু সামনের দিকে হাঁটলেই ফুফীর বাড়িটা। গিয়েই দেখি ফুফী রান্না ঘরে, আর হুজায়ফা একটা বল নিয়ে খেলা করছে। ফুফী আমাদের দেখেই মুচকি হেসে বেড়িয়ে আসলেন। আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে, টেনে ঘরে নিয়ে বসালেন। আমি, দাদু, হুজায়ফা নাস্তা করছি এমন সময়ই আংকেল আর লিমা আপু আসলেন। কিন্তু লিমা আপু এই রুমে প্রবেশ করলেন না। আংকেল সালাম দিয়ে কুশলাদি জানতে চাইলেন। একটু পরেই পাশের রুম থেকে হুজায়ফার ডাক পরলো। ভাইয়া একটু শুনে যাও তো। ও একহাতে আপেল আরেক হাতে আঙুর নিয়ে দিলো এক দৌঁড়। এসে বললো আপু তোমাদের দুজনকে সালাম জানিয়েছেন আর নানু তোমাকে তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করে আপুর রুমে যেতে বলেছে।

ছোট্টমুখে কথাগুলো কত সুন্দর লাগছিলো তোমাদের বুঝাতে পারবোনা। আমি তখন তাইসীর জামাতে পড়ি। পর্দা সম্পর্কে তেমন অবগত না। কিন্তু তার পরেও অবাক হলাম ! আজকের অপসংস্কৃতির কবলে আধুনিকতার নামে আমরা যেভাবে খ্রিস্টানদের অনুসরণ করছি এই শহুরে পরিবেশ এমনটা চোখেই পরেনা। এদিকে ফুফী বলে উঠলেন, তোমাদের তো জানানোই হয়নি। লিমাকে এবার কমলাপুর মাদরাসায় ভর্তি করেছি। ঈদের আগেই নাজেরা শেষ হয়ে যাবে। অনেক সুন্দর তেলাওয়াত করে সব শিক্ষিকাই ওর প্রশংসা করেন। শুনে আরো খুশি হলাম।

চারটি দিন যেন খুব তাড়াতাড়িই কেটে গেলো। আর দুদিন পরেই বাড়িতে যাবো। ছুটিটা বেশ ভালোই কাটছিলো। অন্যন্য ছুটির থেকে একেবারে আলাদা। সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি। কখনো ঝড়ো বাতাস। আবার কখনো মেঘের সাথে ঘুমের বোল। তবে ঐ ছুটিতে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম ইচ্ছে মতো। ছাদের উপর থেকেই কদম ফুল ছেঁড়া যেতো। কেমন যেন ফুলেরাও স্নান সারতো আমাদের সাথে। কদম ফুলের পরাগ খুলে ছাদের উপরে লিখতাম নাম। সে কথাগুলো মনে হলে আজো ছুঁটে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আজ অনেকটা বড়ো হয়ে গেছি। হয়েছি পরিবারের বোঝা। ছুটি বলতে আজ রবি ঠাকুরের ”ছুটি গল্পে”র শেষ পৃষ্ঠাটাই শুধু বাকী।

বৃহস্পতি বার। কালই মাদরাসা খুলবে। বিকেলেই বাড়ি যাচ্ছি। দাদু বলেছিলো আর দুটো দিন থেকে যাই না, আবার কবে আসি ? আমি সবকের গুরুত্ব বুঝিয়ে সেবার মাফ পেয়েছিলাম। বিদায় জানানোর জন্য ফুফী, হুজায়ফা দরজায় দাঁড়ালেন। ভেবেছিলাম অন্তত আজ লিমা আপু বিদায় জানাতে আসবেন। কিন্তু তখনও আসেনি। সালাম দিয়ে বিদায় নিলাম। আসার সময় এ পথটুকু হেঁটেই এসেছিলাম, ফুফীই ব্যাগটা বড় করে দিয়েছে। বিক্সার জন্য দাড়িয়ে আছি। এমতাবস্থায় লিমা আপু হুজায়ফাকে ডাকলেন এবং আমাদের একটু দাড়াতে বললেন। কিছুক্ষণ পরেই দেখি একটি বই নিয়ে দৌঁড়ে এলো। তারপর বইটি আমার হাতে দিয়ে বললো আপু তোমাকে দিয়েছে।

বইটির প্রচ্ছদ আর লেখকের নাম দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। ওখানেই শুরু করা দিলাম পড়া। ‘সুখিয়া’ বিষিষ্ট সাহিত্যিক রোকন রাইয়ান স্যারের লেখা। রোহিঙ্গাদের জীবন কাহিনী সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এতে।  দাদু তো বলেই ফেললো, এখান থেকেই বইটি পড়ে শেষ করে যাবি নাকি ? আমি এবার একটু জোরেই বললাম, অটো তো আসছে না। তাই না, কয়টা গেলো হিসেব আছে ? আমাদের দুজনের তর্ক দেখে ফুফীই এবার একটি অটো দাঁড় করালেন। ওঠে বসলাম অটোতে।

তারপর কেটে গেলো কতটি বছর। হারিয়ে গেলো কত আপন জন ! এই নিষ্ঠুর শহরে বসে, শুধু দূরে থাকা কাছের মানুষগুলোর জীবনের শেষ দিনটাই ডায়েরীতে লেখার সৌভাগ্য হয়েছে। দাদুকে শীতল মাটিতে শুইয়ে এসেছি সেই কবে, হিসেব ধরেনা দুই হাতে। নানুও চলে গেলো শেষ দেখাটা পর্যন্ত দেখতে পারিনি। আর এবার সাতাশে রমজানে সেই লিমা আপুর কবরটা জিয়ারত করে আসলাম। এসব মনে হলে স্থির থাকতে পারি না। স্থির থাকা যায় না। মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যবধানে জীবন ডায়েরী থেকে মুছে গেলো কত নাম। লেখা হলো চিরস্থায়ী ডায়েরীতে। যেখান থেকে কোনদিনই মুছবে না ঐ রেখাপাত। আর ওটার নামই হচ্ছে চিরস্থায়ী আখিরাত। যেখানে আমাদের সকলেরই শেষ ঠিকানা। হে আল্লাহ তুমি আমার দাদু নানু আর লিমা আপুকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। (আমীন)।

Print Friendly, PDF & Email