মঙ্গলবার, ১০ই ডিসেম্বর ২০১৯ ইং, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
সম্ভাবনাময় পথশিশু
নভেম্বর ১৬, ২০১৯
সম্ভাবনাময় পথশিশু

আজকের শিশুই আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। শিশুদের মানসম্মত ও সুস্থ জীবনযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিশুশ্রম আইন ২০০৬ করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজ করানো হলে তা শিশু শ্রমের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। কেউ যদি শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে, তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হবে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। আগে ১২ বছরের শিশুরা হালকা কাজের এ সুযোগ পেত।

উপরের বর্ণিত আইনটির কতটুকু বাস্তবায়ন ঘটেছে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। শিশুশ্রম নিষিদ্ধ আইন জাতীয় সংসদে পাস হলেও কার্যত এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিশুর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হলে কোন কারখানা বা অফিস বা বাসায় কাজ করতে পারবেনা। কিন্তু  আজও  দেশে অনেক গার্মেন্টস, বাসা-বাড়ি, খামার ও জমিতে শত শত শিশুকে শ্রম দিতে দেখতে পাওয়া যায়। অধিকন্তু শিশুশ্রমের নতুন নতুন উপায় আবিষ্কৃত হয়েছে। শিশুশ্রম আইনের  যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় ১২-১৫ বছরের শিশুরা জন্ম নিবন্ধন ও ভোটার আইডি কার্ডে বয়স বেশি দেখিয়ে কোম্পানি ও গার্মেন্টস ও বিভিন্ন অফিস বাসা বাড়িতে কাজ করছে। এটি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিছুটা মেনে নেওয়া যায়।

আরেকটি অভিনব শিশুশ্রমের উপায় রয়েছে। বাংলাদেশে আরেক শ্রেণির শিশু রয়েছে  যাদেরকে বলা হয় পথশিশু। শিশুদের মধ্যে এই শ্রেণির শ্রম খুবই বেদনাদায়ক। এদের একেক জনের জীবন কাহিনী শুনলে পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়। ইট পাথর আর মায়াহীন শহরে বলতে গেলে কেউ ই নেই তাদের। এরা কনকনে শীতের রাতে কিংবা দুমুঠো ভাতের জন্য অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই নির্দয়া মানুষের মন থেকে দয়া বের করা যে কত কষ্টকর তা এই পথশিশুরাই ভালো জানে। তাই সারা দিন রাত না খেতে পেয়ে হয়তো এই শহরের গলিবয় রানা, টিএসসির ফুল বালিকা সিনথিয়াদের বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এরাও সমাজের আরও ১০ জন স্বাভাবিক শিশুর মত মায়ের হাতে তুলে দেওয়া খাবার খাওয়া এবং অভিভাবকের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। পৌষ-মাঘ মাসের গভীর শীতে তুষারের কনকনে একটা ছেঁড়া কাপড় পরিধান করে রাত যাপন করা কি কষ্টকর তা হয়তো সাধারণেরা উপলব্ধি করতে পারে না। এই জন্য কবি বলেন কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে। এই শিশুরা তখন নিজেকে মনে করে জন্মই যেন তাদের আজন্ম পাপ!

কিন্তু এই শিশুটিকেই পরিচর্যা করে একজন সুনাগরিক বানানো সম্ভব হয়। এমনকি এই রাস্তার ধারে অসহায় কাতরানো শিশুটিই হতে পারে আগামী বিশ্বের আলবার্ট আইনস্টাইন কিংবা আব্রাহাম লিংকন। এরা জীবনকে যতটা কাছে থেকে উপলব্ধি করতে শিখেছে অন্যরা তা পারে নাই।  যে সময় টাতে তাদের হেসে খেলে কাটানোর কথা সেই সময়ে তাদের জীবিকার জন্য হন্য হয়ে ছুটতে হচ্ছে। একটা রুটি চুরি করে খাওয়ার অপরাধে শিশু রাজনের মত একজন অপার সম্ভাবনাময় বালককে নির্মম শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে অকালেই মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়েছে।

আসলে কি এদের কোথাও কেউ নেই?  না পরিবার, না খেলার সাথী, না পড়ার স্কুল, না বাবা-মা না রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা!  তাহলে কি এত এত জাতীয়, আন্তর্জাতিক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে কি করবে এই শিশু শ্রমিক ও পথশিশুরা?

এই অপার সম্ভাবনাময় নৈসর্গিক শিশুদের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে। নারী ও শিশু অধিদপ্তরের পাশাপাশি পথশিশু অধিদপ্তর প্রবর্তন করতে হবে। সকল পথশিশুদের এর আওতায় এনে এদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে উজ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে। অন্যথায়, এই শিশুই আগামীদিনের বিভিন্ন অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়বে এবং রাষ্ট্রের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠবে।

এই পথশিশুরাই কবি রফিক আজাদের ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাবো কবিতার মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসবে। সর্বপরি, সরকারী উদ্যোগের সাথে বেসরকারী উদ্যোগেরও বিশেষ প্রয়োজন আছে এই পথশিশুদের পূণর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। তাহলেই একদিন সমাজের মূলধারায় সংযুক্তির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে সমান ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে তারা এটাই প্রত্যাশা করি।

লেখক, আবু হুরাইরা আতিক
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email