বৃহস্পতিবার, ৯ই এপ্রিল ২০২০ ইং, ২৬শে চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
সিটি নির্বাচনে ভোটার কই!
ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০
সিটি নির্বাচনে ভোটার কই!

নানামুখী সংকট ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে গত ৩১ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হলো বহুল আলোচিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। একটি সুষ্ঠ অবাধ অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন করারা পরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন কত মার্কস পেলো চারদিকে এখন তাই আলোচনা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কার্যকরী প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থাৎ বিএনপি অংশগ্রহণ করায় যেখানে সকলে প্রত্যাশা ছিল একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূল ও অংশগ্রহনমূলক সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সেখানো ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিত এতো লঘু হবে সেটা কেউ ধারণাই করতে পারেনি।

দেশের প্রায় সকল পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমেগুলোতে প্রচারিত সংবাদগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে যে হাহাকার ফুটে উঠেছে তা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য খুবই হতাশাজনক। দেশের প্রথমশ্রেণীর গণমাধ্যমগুলোর প্রচারিত তথ্যানুসারে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র ভোটারের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। যদিও নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক ভাবে ভোটেরারের উপস্থিতি নশ্চিত করেছেন ৩০ শতাংশ।

যদিও আমরা সরেজমিনে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যনে দেখেছি কোন কোন কোন্দ্রে ভোট পড়ছে মাত্র ৩০-৪০টি। মিরপুর ও এর আশে পাশের কেন্দ্রগুলোতো ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৭-৮ শতাংশ।অন্যদিকো মোহাম্মদপুর ও তার আশেপাশের কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতির হার ছিল তুলনামূলক বেশি প্রায় ১২-১৫ শতাংশ। লক্ষ্য ভোটারের বিপরীতে এই গুটি কয়েক ভোট যে ভোটের খরা চলছে সেটিরই প্রতিনিধিত্ব করে। বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৪.৯ শতাংশ, দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১.৩ শতাংশ, তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬১.৩ শতাংশ, চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৫২.৫ শতাংশ, পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৫৫.৪ শতাংশ, সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৭৫.৪৯ শতাংশ, অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৭৫ শতাংশ ও দশম সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়ে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাচনগুলোতে ভোটকেন্দ্র প্রকাশ্য দুর্নীতি, অনিয়ম ও কারচুপীর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নুর্বাচন কমিশন কোন কার্যকর পদক্ষে নিতে ব্যার্থ হয়। যার ফলে নিবাচন কমিশনের উপর মানসুষের আস্থা দিনকে দিন নাজুক হয়েছে। এরই বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে। এছাড়া ভোটকেন্দ্রর সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়েও বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের বরাবর অভিযোগ ছিল।

এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কোন দিশা না পেয়ে শেষে প্রার্থীদের দ্বায়ী করে বসলেন প্রার্থীদের নাকি দায়িত্ব ছিল ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব কী? শুধু যেনেতেনো ভাবে একটি দায়সারা নির্বাচন করে পার হয়ে যাওয়া?

নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রগুলোতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের বেশ সচেতন ও গোছালো দেখা গেছে। বুঝাই যাচ্ছে তারা কোন প্রকার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। যেভাবে হোক জয় তাদের চাই! এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের সবগুলো কেন্দ্রতে আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের উপস্থিত ও প্রভাব ছিলো চোখে পরার মতো। বিএনপির বরাবরের মতো অভিযোগ তাদের এজেন্টদের নাকি ভোট কেন্দ্রে ঢুকতেই দেয়া হয় নি। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার খবরে আমরা দেখেছি, ঢাকা উত্তর সিটির ১৪ টি কেন্দ্রের মধ্যে শুধু মাত্র মুহাম্মদপুরে বিএনপির এজেন্ট পাওয়া যায়। যদিও ঐ এজেন্ট কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করছিলেন।

অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১৫টির কেন্দ্রের একটি বাদে অন্যগুলোতে বিএনপির কোন এজন্ট ছিল না। যদি দুই সিটি কর্পোরেশনের সব গুলো কন্দ্রেই আওয়ামিলীগ সমর্থীতদের এজেন্টগণ উপস্তিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে নিএনপির শতাধিক এজেন্ট বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয় ক্ষমতাসীন দল। তবে নির্বাচন কমিশনার এ ব্যাপার বরাবরই নিরুত্তর। নির্বাচনের ভোট কেন্দ্রগুলো আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একচ্ছত্র আধিপত্য নির্বাচনের পরিবেশের সুষ্ঠতা ও নিরাপত্তা ব্যাবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

এর আগে বিভিন্ন জাতীয় বির্বাচনে পরীক্ষামূলক ভাবে মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যাবহার করা হলেও এবারই প্রথম সম্পূর্ণ নির্বাচনটি ইভিএমের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ইভিএম নিয়ে বিরোধী দলগুলো মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না। তার বরাবরই ইভিএমকে সরকারের ডিজিটাল জালিয়াতি হাতিয়ার বলে অভিযোগ করে আসছিল। এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের ব্যাপারে ভোটরদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থা করছে সেটি হচ্ছে ভোটারের উপস্থিতি। টিভি মিডিয়ায় বিভিন্ন ভোটারদের খন্ড সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ভোটারদের খোভ। অনেলই এমন ধারণা পোষণ করে ভোট দানে বিরত থেকেছেন যে, যে জয়ি হবার সে এমনিতেই জয়ী হবে, তারা ভোট দিলেও না দিলেও। ভোটারদোর মাঝে এ ধরনের বদ্ধমূক নেতিবাচক ধারণা নিঃসন্দেহে একটি গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন ব্যাবস্থার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক।

নির্বাচন কমিশনের একক প্রচেষ্টা কিছুতে এরূপ উদ্ভূত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই এদেশের জনগণের পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট প্রদানের অধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থার প্রতি সম্মান জানিয়ে আওয়ামীলীগ, বিএনপিসহ সকল বিরোধীদলকে সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে হবে। কেননা নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী দলগুলোর মাঝে গণতান্ত্রিক মনোভাব না থাকলে শুধু মাত্র নির্বাচন কমিশনের সীমাবদ্ধ দৌড়-ঝাপ দিয়ে সুষ্ঠ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়।

বিগত সালের ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের একতরফা নির্বাচনের ফলে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনসাধারণের মনে যে গভীর অনাস্থা সৃষ্টি তা দূর করতে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই উদ্যোগী হতে হবে। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলকেও গণতন্ত্র ও জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে ছাড় দেওয়ার মানসিকতায় আসতে হবে। কেননা প্রত্যেক দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করা না গেলে দলীয় সকারের অধীনে সুষ্ঠ নির্বাচন বেশ চ্যালেঞ্জিং। অপরদিকে বিরোধীদলগুলোকেও কাদা ছোড়াছোড়ি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের বিরূদ্ধে কুচক্রন্ত সূলভ শুধু নামমাত্র নির্বাচনে অংশগ্রহন না করে বরং দেশ ও দেশের গণতন্ত্রের কথা মাথায় রেখে যার যার অবস্থা থেকে সৎ ও বলিষ্ঠ ভাবে নির্বাচনের মাঠে নামতে হবে। তবেই জনগণ তাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে ভোট দিতে ভোট কেন্দ্র ছুটবে। যা এদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিকে করবে শক্তিশালী ও মজবুত।

সিয়াম আহমেদ
sminforme@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email