মঙ্গলবার, ১০ই ডিসেম্বর ২০১৯ ইং, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
সুন্দরবন রক্ষায় আরও যত্নশীল হওয়া উচিৎ
নভেম্বর ১৫, ২০১৯
সুন্দরবন রক্ষায় আরও যত্নশীল হওয়া উচিৎ

সুন্দরবন। শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি নিদর্শন। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকায় অবস্থিত এ অপরূপ সৌন্দর্যের বনভূমি। এর বিস্তৃতি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা এবং ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাজুড়ে। এটিই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে, আর বাকি অংশ ভারতে। সুন্দরবন ১৯৯২ সালের ২১ মে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে।

জনশ্রুতি অনুযায়ী সুন্দরবন নামটি এসেছে সুন্দরী গাছ থেকে। মাঝারি গড়নের চিরসবুজ গাছ সুন্দরী। অত্যন্ত শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সেই সুন্দরবন হারাতে বসেছে তার সৌন্দর্য। রামপাল কয়লা ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মিথস্ক্রিয়া থাকলেও ইউনেস্কোর দেওয়া রিপোর্টের পর তা অনেকখানি চুপসে গেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবনের যে ক্ষতি হবে, তা অপূরণীয়।

কিন্তু এই সুন্দরবন বাংলাদেশে সদ্য আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ অনেকটা দমিয়ে দিয়েছে। ১০ নভেম্বর ২০১৯ প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ‘প্রথমে ভারতীয় অংশের সুন্দরবনের সাগরদ্বীপে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে। এরপর এটি বাংলাদেশের সুন্দরবনের খুলনা অংশে ঢুকে পড়ে। দুই দেশের সুন্দরবনের গাছপালায় বাধা পেয়ে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রে বাতাশের গতিবেগ ঘন্টায় প্রায় ২০ কিলোমিটার কমে যায়। জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতাও কমে আসে। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেল দেশের উপকূলের বিপুলসংখ্যক মানুষ। এর আগে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা একইভাবে সুন্দরবনে বাধা পেয়ে দূর্বল হয়ে পড়েছিল’ সংবাদটি খেয়াল করলে বুঝা যায় বাংলাদেশে আঘাত হানা বড় বড় ঘূর্ণিঝড় থেকে দেশকে বাঁচাতে অনেকটা অবদান রেখেছে সুন্দরবন।

সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, গত ২৫ বছরে সুন্দরবনের প্রধান সম্পদ সুন্দরী গাছ যে পরিমাণে কমেছে, তা প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টরের সমান হবে। গাছ কমতে থাকায় সুন্দরবনের ভেতরে ঘন বনের পরিমাণ গত ২৫ বছরে কমেছে ২৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএসএইড ও জন ডি রকফেলার ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট সুন্দরবন নিয়ে ‘সুন্দরবনের পর্যটন, ঘূর্ণিঝড় থেকে বসতবাড়ি সুরক্ষা এবং আহরিত সম্পদের আর্থিক মূল্যায়ন’ শিরোনামে একটি গবেষণা করে। এ গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এএইচএম রায়হান সরকার। এতে সহায়তা করেন স্পার্সোর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মেহেরুন নেসা। গবেষণাটি ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে চলে দীর্ঘ ৩ বছর।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালে সুন্দরী গাছ বনের ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪৫ হেক্টরজুড়ে ছিল। ২০১৪ সালে তা কমে গিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৯৫ হেক্টর হয়। সুন্দরীর পাশাপাশি গেওয়া গাছও দিন দিন কমছে। ১৯৮৯ সালে বনের ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৭৭ হেক্টরজুড়ে ছিল এ গাছ। ২০১৪ সালে তা অর্ধেকে নেমে ৭৪ হাজার ১৭০ হেক্টরে পরিণত হয়। বনের ঘনত্ব ও গাছপালার পরিমাণ নির্ধারণ করার জন্য গবেষকরা ১৯৮৯ সাল থেকে পাওয়া সুন্দরবনের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখেন, ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনের ঘন বনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা হয় ৩৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনের জলাধার ছিল ২৯ শতাংশ এবং খালি ভূমি ছিল ২ দশমিক ৬০ শতাংশ। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে তা বেড়ে জলাধার হয় ৩২ শতাংশ ও খালি ভূমি হয় ৮ শতাংশ। (তথ্যসূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি ২০১৮)।

সুন্দরী গাছ মূলত বনের ভেতরে মিঠাপানির এলাকায় বেশি হয়। কিন্তু লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। বন থেকে এ গাছই চুরি হয় বেশি। এমন হলে সুন্দরবন হারাবে তার জীববৈচিত্র্য ও মূল বৈশিষ্ট্য। পাশাপাশি ঘন বনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে হালকা বনের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ঘন বনের ক্ষেত্রে বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ এবং সূর্যের আলো বৃক্ষ আচ্ছাদন ভেদ করে মাটিতে আসতে পারে না। কোনো বনের বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সেটি হালকা বনে রূপ নেয়। বন হালকা হলে ভূমি ক্ষয় হয়। বনে পশুপাখির বসবাস অনিরাপদ হয়ে ওঠে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন সুন্দরবন নামক কিছুর অস্তিত্বই থাকবে না! তাই সময় থাকতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি একান্ত কাম্য।

মাহবুব এ রহমান
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email