বুধবার, ২৯শে জানুয়ারি ২০২০ ইং, ১৬ই মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
সূর্যগ্রহণ নিয়ে কুসংস্কার ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
জানুয়ারি ১, ২০২০
সূর্যগ্রহণ নিয়ে কুসংস্কার ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

গত ২৬ ডিসেম্বর দেখা গেল বিরল সূর্যগ্রহণ। বাংলাদেশ থেকে এই মহাকাশীয় ঘটনাটি আংশিক দৃশ্যমান হয়েছিল যার স্থায়িত্ব কাল ছিল আড়াই ঘন্টার মত। তবে এবারের সূর্যগ্রহণে একটু ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। গ্রহণের সময় সূর্যের চারপাশে আগুনের গোলক দৃশ্যমান হয়েছে। একে বলা হয় “রিং অব ফায়ার” বা অগ্নিগোলক। সর্বশেষ ১৭২ বছর আগে এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছিল পৃথিবীবাসী।

সূর্যগ্রহণ নিয়ে সমাজে অনেক ধরনের কুসংস্কার আছে। তেমন কিছু কুসংস্কার বা ভুল ধারণা তুলে ধরা হলোঃ-

১. রান্না করা, খাবার খাওয়া

এরকম একটি কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে যে, সূর্যগ্রহণের সময় কোনো ধরণের খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক জায়গায় এরকমও ধারণা রয়েছে যে সূর্যগ্রহণের সময় রান্না করা হলে সেটিও অমঙ্গলজনক। কিন্তু এরকম ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বিজ্ঞানীরা কখনোই পাননি।

২.গর্ভবতী নারীদের বাইরে বের হওয়া

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সূর্যগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারীরা ঘরের বাইরে বের হলে গর্ভের সন্তানের শরীরে বিশেষ ধরণের জন্মদাগ থাকতে পারে। এমনকি সন্তানের হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকা বা বিকলঙ্গতা নিয়েও সন্তান জন্ম নিতে পারে। তাই, ‘সংস্কার’ আছে, সূর্যগ্রহণের সময়ে গর্ভবতী নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। এই ধারণাও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে অনেক আগেই।

৩. ভ্রমণ না করা

সূর্যগ্রহণ চলাকালীন ভ্রমণ করলে তা অমঙ্গলজনক – এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে অনেক মানুষের মধ্যেই। আরেকটি ধারণা রয়েছে যে, সূর্যগ্রহণের সময় ভ্রমণ করলে গ্রহণের সময় সূর্য থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর রশ্মি গায়ে লেগে ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নওরীন আহসান বলেন গ্রহণের সময় সূর্য থেকে আলাদা কোনো ক্ষতিকর রশ্মি নিঃসরণ হয় না, কাজেই আলাদাভাবে কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

৪. গ্রহণের পর গোসল করা

সূর্যগ্রহণের ফলে তথাকথিত যেসব ক্ষতিকর রশ্মি শরীরের সংষ্পর্শে আসে, সেসব রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে রক্ষা করতে গ্রহণের শেষে গোসল করার উপদেশ দেয়া হয়ে থাকে কিছু ক্ষেত্রে। এই ধারণাটিও সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক নওরীন আহসান।

“সাধারণ অবস্থায় সূর্যের রশ্মি গায়ে লাগলে যতটা ক্ষতি হোতো, সূর্যগ্রহণের সময় তার চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কাজেই সূর্যগ্রহণের সময় যে আলাদাভাবে অতিরিক্ত ক্ষতি হবে, এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।”

৫. বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে সূর্যগ্রহণ দেখা

সূর্যগ্রহণ দেখার ক্ষেত্রে চোখের সুরক্ষার জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার উপদেশ দেয়া হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিষয়ক সংস্থা নাসা খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখা থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিয়েছে। সামান্য সময়ের জন্যও খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখলে চোখের ক্ষতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।

তবে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নওরীন আহসানের মতে, শুধু সূর্যগ্রহণের দিনই যে সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকানো উচিত নয় – এমনটা নয়।

“সূর্যগ্রহণের দিন মানুষ সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকায়, কারণ সেদিন সূর্যের প্রখরতা অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক কম থাকে। তাই মানুষের অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে থাকার সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকে – যেটি ক্ষতির কারণ হতে পারে।”

“যে কোনো সাধারণ দিনে মানুষ সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকালেও চোখের ক্ষতি হবে। পার্থক্যটা হলো, সাধারণ দিনে মানুষ তাকায় না, সূর্যগ্রহণের সময় মানুষ তাকায়, তাই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়”, বলেন অধ্যাপক নওরীন আহসান।

তবে ঢাকা বিশ্যবিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নওরীন আহসান বলছেন, এসব ধারণার প্রায় সবগুলোই সম্পূর্ণ ভুল এবং এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

 

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : আমরা ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই নিদর্শনাবলি প্রেরণ করি। (সুরা ইসরা: ৫৯)

চন্দ্র, সূর্য, এই আসমান, জমিনসহ সমস্ত মাখলুকাত আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহ তাআলার কুদরতের দুটি অন্যতম নিদর্শন। মোটকথা সবকিছুই আল্লাহ তাআলার অপার কুদরতের নিশানা।

জাহিলিয়াতের যামানায় লোকেরা মনে করত বড় কোনো ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে মনে হয় সূর্যগ্রহণ লাগে। মুগিরা ইবনু শু’বা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পুত্র ইবরাহীমের মৃত্যুর দিনটিতে সুর্যগ্রহণ হলো। তখন আমরা সকলে বলাবলি করছিলাম যে, নবীপুত্রের মৃত্যুর কারণেই এমনটা ঘটেছে। আমাদের কথাবার্তা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন তোমরা আল্লাহর নিকট দুআ করবে। তাঁর মহত্ব ঘোষণা করবে এবং সলাত আদায় করবে ও সাদাকা প্রদান করবে। (বুখারি ও মুসলিম।)

আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত: নবি কারিম (সা.) এর যামানায় একবার সূর্যগ্রহণ লাগল। তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কিয়ামাত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। অবশেষে তিনি মাসজিদে এসে নামাযে দাঁড়ালেন এবং সবচেয়ে লম্বা কিয়াম, লম্বা রুকূ, লম্বা সিজদাহ সহকারে নামায আদায় করতে লাগলেন। আমি কখনও কোন নামায তাঁকে এত লম্বা করতে দেখি নি। নামায শেষ করে তিনি বললেন, এসব নিদর্শনাবলী যা যা আল্লাহ জগতে পাঠান, কোন ব্যক্তির মৃত্যু বা জীবনের কারণে অবশ্যই তা হয় না। বরং আল্লাহ এগুলো পাঠিয়ে বান্দাদের সতর্ক করেন। অতএব তোমরা যখন এমন কিছু দেখতে পাও, তখন তোমরা ভীত হয়ে আল্লাহর যিকর, দুআ ও ইস্তিগফারে মশগুল হও। (সহীহ মুসলিম: ১৯৮৬)

হাদীসদ্বয় থেকে সূর্যগ্রহণ লাগলে আমাদের পালনীয় আমল সম্পর্কেও জানতে পারলাম। সে সময় দুআ করা, তাসবীহ পাঠ করা, তাওবা-ইস্তেগফার করা, নামায আদায় করা ও সাদাকা দেওয়া কর্তব্য। তাছাড়া এ সময় অনর্থক গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা ছেড়ে অন্তরে ভয় জাগ্রত রাখাও কর্তব্য। কেননা হাদীসে এসেছে এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে সতর্ক করেন। ভয় প্রদর্শন করেন। তাই আল্লাহর প্রকৃত বান্দারা এ সময় আল্লাহর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। বিভিন্ন হাদীস থেকে রাসুলে আকরাম (সা.) থেকে এ সময় উপরোক্ত আমলগুলো প্রমাণিত। মোটকথা ‘গ্রহণ’কে সূর্য ও চন্দ্রের ওপর একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল বা বিপদের সময় বলে গণ্য করা হয়েছে। এ জন্যে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় মুমিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন এ সময় অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ রেখে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ, দোয়া, সালাত আদায় প্রভৃতি আমলে মাশগুল থাকে।

 

গর্ভবতী মহিলাদের উপর চন্দ্র ও সূর্য গ্রহনের প্রভাব কি এবং ইসলাম কি বলে…?

সূর্যগ্রহণ: চাঁদ যখন পরিভ্রমণরত অবস্থায় কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর কোন দর্শকের কাছে সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায় (কিছু সময়ের জন্য)। এই ঘটনাকে সূর্যগ্রহণ বলা হয়। আমাবশ্যার পরে নতুন চাঁদ উঠার সময় এ ঘটনা বেশি ঘটে। পৃথিবীতে প্রতি বছর অন্তত দুই থেকে পাচঁটি সূর্যগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়। এর মধ্যে শূন্য থেকে দুইটি সূর্যগ্রহণ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়। আরবিতে এর নাম কুসুফ। ইংরেজীতে একে Solar eclipse বলে।

চন্দ্রগ্রহণ: পৃথিবী তার পরিভ্রমণ অবস্থায় চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এলে কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরল রেখায় অবস্থান করতে থাকে। তখন পৃথিবী পৃষ্ঠের মানুষ/প্রাণীদের থেকে চাঁদ কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাকে চন্দ্রগ্রহণ বলে। আরবিতে খুসুফ এবং ইংরেজীতে Lunar eclipse বলে।

কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী সূর্য গ্রহন ও চন্দ্র গ্রহনের কোন প্রভাব গর্ভবতী মা, বা তার গর্ভস্থ ভ্রুনের উপর পড়ে না। গর্ভবতী মা কোন কিছু কাটলে, ছিঁড়লে বাচ্চা ঠোঁট কাটা জন্মাবে, কোন কিছু ভাঙলে, বাঁকা করলে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেবে – এধরনের যত কথা প্রচলিত আছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা, যার সাথে কুরআন ও সুন্নাহর কোন সম্পর্ক নেই। চন্দ্র, সূর্য বা অন্য কোন সৃষ্ট বস্তু অদৃশ্য ভাবে কারও উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে এধরনের বিশ্বাস রাখা তাওহীদের পরিপন্থী। যে আল্লাহ তা’য়ালা ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে তার মনে রাখা উচিত, এই দৃশ্য থেকে বোঝা যায় যে মহান আল্লাহতালা চাইলে তার ইশারায় এক সেকেন্ডের মধ্যে আসমান জমিন চন্দ্র-সূর্য সব ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারে। তাই আমাদের উচিত মহান রবের পথে ফিরে আসা, আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জন করা, যতদিন বেঁচে থাকি হালাল উপার্জন করা।

নুরুল আমিন জিহাদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ সুইডেন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট

Print Friendly, PDF & Email