রবিবার, ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
header-ads
স্বর্গের সিঁড়ি – তুহিন হোসাইন
নভেম্বর ১, ২০১৯
স্বর্গের সিঁড়ি – তুহিন হোসাইন

ভোর চারটা। রাতের আঁধার এখনো কাটেনি। মেঘের আড়াল থেকে নিশাকর থেকে থেকে নিজের সত্তার জানান দিচ্ছে। নিশাচর প্রাণীকূলের খুব বেশি প্রয়োজন পড়ছে না তার জ্যোতি। দূর থেকে শেয়াল কুকুরের আত্মচিৎকার ভেসে আসছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে আজ দু’পক্ষই বেশ সজাগ। তাহেরের রুম থেকেও অস্পষ্ট কিছু শব্দ এসে যুক্ত হয়েছে। রডলাইটের তীব্র সাদা আলোয় বইয়ের পাতা গুলো একে একে নিঃশেষ করে চলেছে। সন্ধ্যায় বানানো ফ্লাক্সের চা টুকু তলানিতে এসে ঠেকেছে। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া গাড়ো কালো তরল পদার্থটি এক চুমুকে নিঃশেষ হয়ে গেল,তিক্ত কটু স্বাদে গাঁ শিরশিরে উঠলো। হাত দিয়ে ঠোঁটে লেগে থাকা চাপাতি মুছে আবার সেই আত্মচিৎকার শুরু হলো।

তাহের শিক্ষাজীবনের পাঠ চুকিয়ে আজ একবছর চাকুরির পেছনে আদা-জল খেয়ে লেগেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় আদা আর জল দুটোই জোগাড় করেছিল। তখন থেকেই খাওয়ার শুরু তবে পরিমাণ ছিলো অল্প। চাকুরীজীবী বড় ভায়েদের উপদেশ,মা-বাবার আদেশ,ইউটিউবে অনুপ্রেরণা দায়ী হাজারো ভিডিও। কোনো কিছুকেই উপেক্ষা করেনি তবুও তাতে লাভের খাতায় শূন্যটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।

জব্বার ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে বিচালি কাঁটছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার সামনে দাঁড়িয়ে কাজটি পর্যবেক্ষণ করছে আব্দুল খালেক। বয়স ষাটের কাছাকাছি,বার্ধক্যের ভারে আড়ষ্ট হয়ে যায়নি দেহটি। খাবার ব্যাপারে খুব সচেতন,রোজ ভোরে বেশ খানেক সময় নিয়ে হাঁটেন। চোখমুখ থেকে জ্ঞানের আভা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা বিভাগের অধ্যাপক তিনি। খুব দাপটের সাথেই দীর্ঘ ত্রিশ বছর নিজ বিভাগ সহ বর্তমানে আরও দুটি বিভাগের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটাকে তার খ্যাতনামা বিভাগের সুখ্যাত করিম শেখ আহমেদের সাথে বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলেটিকে ওই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণির কমকর্তা পদে নিযুক্ত করেছেন। কোয়াটারে বেশ ভালো রুমই পাইয়ে দিয়েছেন। সেখানে পরিবার নিয়ে সে বহাল তবিয়তেই আছে। ছোট ছেলেটি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। এসএসসি তে অল্পের জন্য(A-)হয়নি। এতে আব্দুল খালেকের তেমন কোন উদ্বেগ নেই। এবার কোন রকমে পাশ হলেই ছেলেকে কোন এক বিভাগে ভর্তি করা তার কাছে খুব বেশি কঠিন হবে না।

ইদানিং দুটি বলদ কিনেছেন আব্দুল খালেক। সন্তানদের থেকে এদের নিয়ে তিনি এখন বেশি চিন্তিত। ব্যয়ভার দিনদিন বেড়েই চলেছে খুদ,ভুসি,খৈল,ঘাস,বিচালি সবই কেনা লাগে। এছাড়া জব্বারকে খাওয়া থাকা বাদে মাস শেষে বাড়িতে পাঠানোর জন্য বেশ কিছু টাকা দিতে হয়। জব্বার মেট্রিক পাস। বলদ দেখভাল করার কাজটি তার মনঃপূত নয়। সুযোগ পেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো একটা চাকরি জুটিয়ে দেয়ার জন্য তাগিদ দেয়। সার আপনার মেলা খেমতা। আমারে কোনো হানে ঢুয়ানো যাইনা?

খালেক সাহেব বলদের মাসিক খরচের একটা তালিকা মনে মনে তৈরি করছিলেন। জব্বারের প্রশ্নে তার চিন্তায় ছেদ ঘটলো। কি বললি? সার আমারে একটু ঢুয়াই দ্যান। তুই তো ঢুকেই আছিস। প্রতিমাসে তোর পেছনেও তো কম খরচ হয়না। কইতেছি কি? কোথাও চাকরি? চুপ থাক বলদ,ফকিরের বাড় বেশি। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর। বেশি লোভ করবি না। তোকে একটা রাজহাঁসের গল্প শোনাই। যদি একটু হুস হয়। মন দিয়ে শোন,এক দেশে ছিল…….. জব্বার আবারও বিচালি কাঁটায় মন দেয়। এমনই গল্প সে আজ তিন মাস যাবত শুনে আসছে।

তাহের পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাত জাগার ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। অনেক বেলা হয়ে গেছে আজ। ঘুম ভাঙলো বাবার প্রবল চিৎকারে। নবাবজাদা হয়েছে বেলা করে ঘুমাবে আর আমি গাধার মত দিনরাত খাটবো। আমার বয়স হয়েছে। আর কত? আমি মরলে সবাইকে পথে বসতে হবে। তাহেরের বাবা জনাব মোজাম্মেল হকের ছোটখাটো একটা মনিহারি দোকান আছে। মাস শেষে দোকান ভাড়া মিটিয়ে খুব অল্প সংখ্যক টাকা সালমার হাতে তুলে দেন। এই সামান্য টাকায় কিভাবে সংসার চলে তা শুধু সালমাই জানে। মোজাম্মেল হক নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে নামাজ আদায় করেন। প্রতিবার নামাজ শেষে তার মোনাজাত দীর্ঘ হলেও সংসারে উন্নতি আজও স্বল্পই রয়ে গেছে। সকাল সকাল ছেলের এমন ভৎসনা শুনে সালমা একটু রাগী গলায় বললেন,এভাবে বলছো কেন আমার ছেলেটাকে? সে চেষ্টা কম করছে না। সব কিছুই কপালের লিখোন। যদি ভাগ্যে থাকে অবশ্যই চাকরি পাবে। তুমি আরও লাই দিয়ে দিয়ে গরু টাকে গাধা বানাচ্ছ। ভাগ্য টাগ্য আবার কি? ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। ওর তো অনেক ইচ্ছা চাকরি করার। তার জন্য রাতদিন খাটছে। কিন্তু উপায় তো কিছুই হচ্ছে না।

মুখে মুখে তর্ক করবেনা খবরদার। মেয়ে লোকে এত কথা বলবে কেন? অধিক কথা বলা আমার পছন্দ না। সালমা চুপ করে যায়। সে জানে এখন কিছু বললে আরও জোরে চেঁচাতে থাকবে। কিন্তু আজ মোজাম্মেল হক যেন চুপ থাকতে নারাজ। সে আবার বলতে শুরু করলো,তোমার অতি পরিশ্রমী গাধা পুত্রকে আমার বন্ধু খালেকের কাছে যেতে বলেছিলাম। তিনি কি সেখানে আজ পর্যন্ত একবারও গেছেন? সালমা মাথা এদিক ওদিক ঘোরালো কিন্তু মুখে কিছু বললো না। তা যাবে কেন? সারাদিন বাড়ি বসে বসে আমার অন্ন ধ্বংস করবে। খালেকের বড় ছেলেটা কত মেধাবী। পড়া শেষ হতে না হতেই চাকরি পেয়েছে। আরও হয়তো বিস্তারিত কিছু আলোচনা করতো। দোকান খোলার সময় হয়ে যাওয়ায় ছাতাটা বগলদাবা করে মোজাম্মেল হক হনহন করে দোকানের উদ্দেশ্যে হাটা শুরু করলো।

সালমা তাহেরের রুমে গিয়ে দেখে সে চুপচাপ বিছানায় পা এলিয়ে বসে আছে। মাকে দেখে তাহেরের মুখে শুষ্ক হাসির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সালমা বললেন,রোজ রোজ তোর এমন কথা শুনতে ভালো লাগে? শুষ্ক হাসির রেখাটা এবার পরিষ্কার হল। তাহের বললো,গায়ের চামড়া এতদিনে গণ্ডারের চেয়ে পুরু হয়ে গেছে মা। আব্বার কোন কথায় এখন আর গায়ে লাগেনা। তুই একটা শিক্ষিত ছেলে। তোর একটা আত্মসম্মানবোধ তো আছে। এবার জোরে হেসে দিলো তাহের কি যে বলো মা!  আমার মত বেকারের আবার আত্মসম্মান। ছেলের কথায় বিমূঢ় হয়ে গেলো সালমা। সে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললো,হ্যা রে তাহের,তোর খালেক চাচার বড় ছেলে পড়া শেষ হতে না হতেই চাকরি পেয়ে গেলো। তুই পড়াশোনায় তার থেকে অনেক ভালো। তাহলে তুই কেন চাকরি পাচ্ছিস না?

লেখকঃ শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া।

Print Friendly, PDF & Email