বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |আর্কাইভ|
২৩ আগস্ট: ঢাবির বুকে ঘৃণিত এক অধ্যায়
আগস্ট ২৪, ২০২০,  ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
২৩ আগস্ট: ঢাবির বুকে ঘৃণিত এক অধ্যায়

২৩ আগস্ট, একটি বর্বরোচিত ঘটনার ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০০৭ সালে ২০ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত তৎকালীন সময়ের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কতৃক নির্মম নির্যাতিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে চলছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের মাঝে আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল খেলা।খেলার মাঠের পাশেই ছিল সেনা সদস্যদের অস্থায়ী ক্যাম্প।একসময় শিক্ষার্থীদের ফুটবল খেলা দেখতে চলে আসে সেখানকার থাকা সেনা সদস্যবৃন্দ।এসে শিক্ষার্থীদের সাথে গ্যালারিতে বসার প্রাক্কালে এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কথার কাটাকাটি বাধিয়ে ফেলে।এতে সশস্ত্র সেনা সদস্যবৃন্দ শিক্ষার্থীদের উপর অপ্রীতিকরভাবে ঝাপিয়ে পড়ে।ফলে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়ে পড়ে।তারই প্রেক্ষিতে ঢাবির শিক্ষার্থীদের উপর সেনাবাহিনীর হাত তোলার প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।ফলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা।শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ

এই সংঘর্ষের প্রতিবাদে ও সেনাসদস্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মদদপুষ্ট হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা।বিক্ষোভ মিছিলে মেতে তোলে রাজপথ, প্রতিবাদী স্লোগানে মুখরিত করে তোলে ঢাবির ক্যাম্পাস।তখনকার সময়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালায় পুলিশ। নীলক্ষেত, টিএসসি, কার্জন হলের এলাকাসহ ক্যাম্পাস পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পুলিশের টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটে আহত হন শত শত শিক্ষার্থী।

তবে এই প্রতিবাদ শুধু ঢাবির বুকেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, এই প্রতিবাদী স্লোগানের শব্দ শুধু ঢাবির বুকেই বেজে ওঠেনি, ওঠেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুমুল আন্দোলনে মেতে ওঠে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনাবাহিনীর ঘৃণিত এই কাজের বিরুদ্ধের দায়ে উপযুক্ত বিচারের দাবিতে তারা তাদের ক্যাম্পাস ও রাজপথে প্রতিবাদী আন্দোলন সৃষ্টি করে তোলে।তারপর ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে সকল জেলা-শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।এক পর্যায়ে আন্দোলন বেগতিক হলে তৎকালীন সরকার বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা চালায়।ফলে সারাদেশে আহত হয় প্রায় শতাধিক বিক্ষোভকারী।রাজশাহীতে রিকশা চালক আনোয়ার হোসেন সেদিন নিহত হয়।আনোয়ার হোসেনের রক্তের জোয়ারে আন্দোলন আরো বেগতিক হয়ে ওঠে।এক পর্যায়ে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিস্থিতি সামাল না দিতে পেরে ২২ আগস্ট সারা দেশে বিভাগীয় ৬ টি শহরে কারফিউ জারি করে।যার কারণে রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।পরে দীর্ঘ ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খোলা দেওয়া হয়।

কিন্তু ২৩ আগস্টে বিক্ষোভকারীদের ইন্ধন যোগানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, সাবেক কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন ও অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিকসহ ঢাবির চার শিক্ষক ও সাত ছাত্রকে।পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষার্থীকেও গ্রেফতার করা হয়।গ্রেফতার করার সময় তাদের চোখে কালো কাপড় বেধে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে।কারাগারে অনেক নির্যাতন, অত্যাচার করার পর তাদেরকে অনেক অর্থ দন্ডে দন্ডিত করা হয়।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের ঘটনায় বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ এনে পরবর্তীকালে সারাদেশ ৮৮ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে আসামি করে মোট ৬৬টি মামলা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৩টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়। ১৬টি মামলা সরকার প্রত্যাহার করে নেয় এবং ৭টি মামলা আদালত খারিজ করে দেন।এমন শত শত ঘটনা বাঙালি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় গনতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ইতিহাস।যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি থেকে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যুগে যুগে সাক্ষ্য রেখে আসছে।

আর এই ঘৃণিত ঘটনাকে স্মরণ করে রাখার জন্য ২০০৮ সালের ২৩ আগস্ট দিনটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় “কালো দিবস” হিসেবে ঘোষণা করে।তখন থেকে এই দিনটি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো দিবস” হিসিবে পালন করা হয়।

শিক্ষার্থী:
জসীম উদ্দিন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

ফেসবুকে আমরা

Facebook Pagelike Widget
আরও পড়ুন